Timeline Alaska -Bhaskar Das

অন্য দেখা

বইঃ টাইমলাইন আলস্কা

লেখকঃ ভাস্কর দাস

প্রকাশকঃ প্রতিভাস

দামঃ ৮০০ টাকা

ভাস্কর দাসকে চিনি আমাদের মেডিক্যাল কলেজের কৃতি ছাত্র,প্রখ্যাত অর্থপেডিক সার্জন হিসেবে। সখ,ভালো ছবি তোলা। আশ্চর্য হলাম যখন ভাস্কর বলল “অনিরুদ্ধদা একটা বই লিখেছি। পড়ে বলবেন কেমন হয়েছে” বইটা অ্যামাজনে অর্ডার দিলাম। ডেলিভারিতে, গৈরিক কালো সংমিশ্রিত সুন্দর মলাট উল্টে, আর্ট পেপারে ছাপান বইটা উলটে-পালটে দেখলাম, প্রত্যাশিত ভাবেই ছবিতে ভর্তি। নিজের একটা খুনের উপন্যাস নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম বলে রেখে দিলাম। সময় পেলে পড়ব। খুনের উপন্যাসে খিচুরি আর জিলিপি পাকাতে মাঝেমধ্যে চিন্তার জন্য বিরতি লাগে। এই বিরতিতেই বইটা তুলে নিয়েছিলাম আলস্কার ভ্রমণ কাহিনি পড়ব বলে।

কিন্তু,না। এ কি পড়ছি! 

ভ্রমণ কাহিনির আপাত অন্তরালে টাইমলাইন আলাস্কাযেন বিশ্ব দর্শন। বিন্দুর মধ্যে সিন্ধুর স্বাদ।ঘর থেকে কিছু পা ফেলে শিশিরবিন্দু নয়,উত্তর মেরুর বুৎপত্তি,বিবর্তন,রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরম্পরায়ের এক সমন্বিত উপাখ্যান। আলাস্কার টাইমলাইন,শুধু ভ্রমণের টাইমলাইন নয়,ইতিহাসের টাইলাইন নয়,বহুমাত্রিক এই লাইন যেন বাধাহীনভাবে খেলে বেড়িয়েছে এক বিশাল খনিজ সম্পদে। ভ্রমণ কাহিনি হিসেবে শুরু,ক্রমশ গভীরে প্রবেশ করছে। অজানা বহু তথ্য গল্পচ্ছলে পেশ করছে। শেষ না করা পর্যন্ত অন্য কাজে হাত দেওয়া বোকামি। 

১১০০০ বছর আগে পৃথিবীর শেষ বরফযুগ থেকে ভাঙাগড়ার মধ্যে আলাস্কার ভৌগলিক বিবর্তন সংক্ষেপে ভূখণ্ডের মানচিত্র আঁকছে। ‘ইটারন্যাল মেহেম’উপন্যাস লেখার সময় রেসিয়াল মাইগ্রেশনের ইতিবৃত্ত লিখতে গিয়ে যে বেরিং স্ট্রেট দিয়ে বেরিঙ্গিয়া,রাশিয়া আর অ্যামেরিকার সংযোগ স্থাপন করেছিল, কিছুটা পড়েছিলাম। এখানে তার বিস্মৃত বিবরণ। কে এই ভিটাস জেনাসেন বেরিং?কে পিটার দ্য গ্রেট,যার নামে রাশিয়ার সেন্ট পিটারসবার্গ? নিকিটা সুগমিন,জর্জ উইলহেম স্টেলারের কাহিনি। নামগুলোই শুধু শোনা ছিল। টাইমলাইন আলাস্কাথেকে জানলাম ওদের জীবন কাহিনি। শুধু জীবনী নয়,সঙ্গে নানাবিধ ছবি,যেমন দাড়ির ট্যাক্সের, সি এপ,সমুদ্র গাভীর,২য় কামচাটকা অভিযানের স্মারক মুদ্রা, বেরিংস ভয়েজেস বইয়ের ছবি – নানান ছবিতে সমৃদ্ধ লেখার পাশেপাশে।ইতিহাস একের পর এক উন্মোচিত হচ্ছে,ভাস্করের সহজ লেখার স্বচ্ছতায়।

২০,০০০ বছর আগে লাস্ট গ্লেসিয়াল ম্যাক্সিমাম থেকে ভাঙাগড়ার মধ্যে আজকের আলাস্কা। তথ্যগুলো নেটে কিছুটা লিপিবদ্ধ থাকলেও,তাকে সাজিয়ে সংক্ষেপে ইতিবৃত্ত বলার মধ্যে লেখকের মুনশিয়ানা স্পষ্ট। এস্কিমো শব্দটির সঙ্গে আমাদের পরিচয় থাকলেও তার মানেটা যে ‘কাঁচা মাংসভোজী’,শুধু এটুকুই জানা নয়। কোথাও কী নামকরণের পেছনে একটা অবজ্ঞা,একটা তাচ্ছিল্য রয়ে গেছে? ‘সভ্য’সমাজের অহং কী প্রকাশ পাচ্ছে না? ইনুপিয়াক,আথাবাস্কান,ইউপিক,অ্যালিউট,অ্যালিউটিক,তিঙ্গিত,সিম সিয়ান,হায়দার বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য বইটা না পড়লে অজানা থেকে যাবে। 

রাশিয়া থেকে বেরিং এবং তাঁর উত্তরসূরিদের আলাস্কা অভিযানের বিভিন্ন ঘটনা বর্ণিত। দেশ আবিষ্কারের সঙ্গে সেই দেশকে লোটার স্পৃহা ‘ফার ট্রেডের’ইতিবৃত্তে প্রকট। সভ্যের বর্বর লোভনগ্ন করল আপন নির্লজ্জ অমানুষতা। প্রকৃতির কোলে, প্রাকৃতিক বেশে, গানে-নাচে প্রাকৃতিক বন্দনায় ভরে থাকত যাদেরসহজ সরল জীবন।সভ্যতার ভয়াবহ কুটিল থাবায় ওদের প্রাচীন সংস্কৃতিকে পেছনে ঠেলে,দেখাল কৃষ্টির নামে সাম্রাজ্যের বিকাশ আর ধর্মের নামে, ওদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে বিলীন করতে, এক কাল্পনিক ঈশ্বরকে সামনে খাড়া করে।সভ্যতা এল।সঙ্গে নিয়ে মানুষের অন্তরের কুটিল নগ্নতা।প্রাকৃতিক সাজে সাজা নারীদের ঘরে ঘরে পৌঁছে গেল ইরটিজমের নগ্নতায়।নিয়ে এল কুটিল সাম্রাজ্যবাদের ভয়াবহ অহংকারর উন্মাদ তাণ্ডব।বিক্রি হয়ে গেল কোমলতা।বিক্রি হয়ে গেল নিষ্পাপ সারল্যে ভরা বনলতার কোলে বড় হওয়া মাধবীলতা।

এ প্রসঙ্গে বহুদিন আগের একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল। আমার বাবা তখন ইউনাইটেড নেশনস-এর ডিপ্লম্যাট হিসেবে থিম্পুতে। গরমের ছুটিতে মেডিক্যাল কলেজ হস্টেল ছেড়ে বাবার ওখানে বেড়াতে গেছি। আমাদের বাড়িতে ডিনারে ভুটানের তদানিন্তন ফরেন মিনিস্টার লাকপা শেরিং রাত্রি ভোজের পরে বাবাকে প্রশ্ন করেছিল “ইটস অল ভেরি নাইস দ্যাট ইউনাইটেড নেশনস ইজ প্রভাইডিং আস এইড। ডস দ্যাট মেক আস এনিওয়ে বেটার উইথ দ্য টেন্টাক্যালস অফ সিভিলাইজেশন?” প্রশ্নটা আদি অন্তকালের। টাইমলাইন আলাস্কা পড়তে পড়তে মনে হল,প্রশ্নটা আজকেরও। তাই কী কবিগুরুর আক্ষেপ দাও ফিরে সে অরণ্য লও এ নগর... হে নব সভ্যতা,হে নিষ্ঠুর সর্বগ্রাসী। দাও সেই তপোবন পুণ্য ছায়ারাসি। গ্লানিহীন দিনগুলি’  

ব্যারানভের ইতিবৃত্ত পড়তে পড়তে কর্ম জীবনের পরিহাসটা আরও বেশি প্রকট হয়ে ওঠে। শাস্ত্রে বারবার সত্যের জয় নিয়ে অনেক জ্ঞানগর্ভ ব্যাখ্যা শুনি। সত্যের কী জয় হয়?না কি নিছকই মন ভোলান সান্ত্বনা? রাজ অনুগত্য,না মানুষের মনের রাজধিরাজ,কোন পথ শ্রেয় ভাবতে হয়। দুনিয়াদারির পথ, জন স্বীকৃতির পথ না নিজস্ব চেতনার পথ – কোনটা শ্রেয় সে বিচারে না গিয়ে,নিজস্ব শান্তিই যে পথের ধ্রুবতারা, এই চেতনাই বোধহয় জাগতিক শান্তির মূলমন্ত্র।

 রাশিয়ার অধীনস্ত আলাস্কা ঘটনাক্রমে কী ভাবে অ্যামেরিকার অন্তর্ভুক্ত হল,তার বিশদ বিবরণ আছে টাইমলাইন আলাস্কাতে। রাশিয়ার কাছ থেকে আলাস্কাকে কেনার ঘটনা সহ,আলাস্কার বিভিন্ন দ্রষ্টব্যের ইতিবৃত্ত সিটকার রেস্টুরেন্টে বসে পাঠককে উপহার দিয়েছে ভাস্কর। সঙ্গে দ্রষ্টব্য স্থানের মনোরঞ্জক ছবি। অবশেষে অনেকেদিন পর অ্যামেরিকার আলাস্কাকে ৪৯তম রাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি। 

ভ্রমণ কাহিনি পড়ব বলে শুরু করেছিলাম। শেষ করলাম দ্য গ্রেট ল্যান্ড আলাস্কার বুৎপত্তি, ইতিহাস, ভূগোল থেকে পলিটিক্যাল এই বিশদ ইতিহাসকে বন্দি করা ১৫৫ পাতার টাইমলাইন আলাস্কায়। বইয়ের সঙ্গে উপহার স্বরূপ পেয়েছি ভাস্করের তোলা একটা ভিডিও। ছাপানর উৎকর্ষতা, আর্ট পেপারে ছাপা অসংখ্য ছবির এই বইটা, সঙ্গে বিশাল জ্ঞানের ভাণ্ডার।৮০০ টাকা দামটা কম-ই মনে হয়েছে।

আলাস্কা যাইনি। যাওয়া হবে কি না, জানি না। ভাস্করের চোখ দিয়ে অন্য আলাস্কাকে দেখলাম। এ দেখাই বা কম কীসের?  

 

 
Facebook Twitter GooglePlus Wordpress Blogger Linkedin Instagram Tumblr Pinterest Hubpages WhatsApp  © 2000 - 2016 | Cosmetic Surgery in Kolkata | Dr Aniruddha Bose | design by Poligon
This page was generated in 0.047 seconds