| | | | | | | | | |

Bhoy

ভয়

সময় যে আর কাটতেই চায় না। সকাল ন’টার মধ্যেই রান্না শেষ। ততক্ষণে অনীশ স্কুলে বেরিয়ে গেছে। এখন বড় হয়ে গেছে। স্কুলে পৌঁছে দিয়ে আসতে হয় না। আগামী বছর মাধ্যমিক দেবে। ঘর ঝাঁট দিয়ে, স্নান সেরে, হেয়ার-ড্রায়ারে বব চুলটা শুকিয়ে হাউস কোটটা ঠিক করতে করতে নন্দিনীর মনে হল, বিয়ে করেও শেষ পর্যন্ত ঘরটা আধুরা রেয়ে গেল। ছবিটা আঁকতে গিয়েও ক্যানভাসে ছবিটা আঁকা হল না। শুধু পড়ে রইল তার আদরের অনীশ। ওকে বুকে আগলে এতটা বছর কেটে গেল, অনীশকে মানুষ করতে করতে। নতুন করে ছবিটা আঁকতে গিয়ে অসমাপ্ত রয়ে গেল ক্যানভাসটা।

কেন যে এমন হয়?

যেদিন অর্ণবকে বিয়ে করেছিল, দুজনে মিলে নতুন একটা ছবি আঁকার স্বপ্ন দেখেছিল। ওর হাত ধরেই মাঝ সমুদ্রে ভেসে বেড়িয়েছিল দেশ থেকে দেশান্তরে। বিয়ের পর প্রথমবার অর্ণব তাকে নিয়ে গেছিল সঙ্গে করে। এক সপ্তাহের ওপর জাহাজে ভেসে বেড়ানো – কলকাতা থেকে হনলুলু। ট্রিপটা ছোট হলেও গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে অর্ণবের সাহচর্য। অন্যদিকে নতুন জীবনের স্বপ্ন। হনিমুনের মাধুর্যে অসীম সমুদ্র আর গভীর নীলের ক্রেডেলে, মধ্য প্যাসিফিকে অনীশের ভ্রূণ নিজের গর্ভে ধরে ঘরে ফিরেছিল নন্দিনী।

অর্ণব বলেছিল “আফটার দিস প্রব্যবলি ইউ কান্ট একম্প্যনি মি এনি মোর। ইন দ্য মিড ওসেন মেটারনিটি সার্ভিসেস আর নট ওয়েল গিয়ারড...”

সেই গিয়ার ঠিক রাখতেই, এত বছর ধরে, একা সংসারের গাড়ি সামলে আর জীবনের স্টারটার চাপা হল না। অনীশ দেখতে দেখতে বড় হয়ে গেল। কিছুদিনের মধ্যেই পিক-আপ নিয়ে ছুটবে। কিন্তু নন্দিনীর গাড়ি স্ট্যাটিক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সিডি ব্লকের বাড়িটার মধ্যে – সামনের মাঠটার দিকে উদাস চোখে যৌবনের বাতিগুলো আস্তে আস্তে নিভে যেতে দেখে, অপরাহ্ণের ধূসর ছবিটা ফুটে ওঠার দিকে উদাসীন ভাবে চেয়ে। না-পাওয়ার পাহাড়টাকে ক্রমশ মেনোপসের দিকে হামাগুড়ি দেওয়া তার পূর্ণ যৌবনকে পাথেয় করে, না পাওয়ার রংটাকে নতুন তুলির টানে ভরিয়ে দিতে, একটা না-চেনা ব্ল্যঙ্ক ক্যানভাসে।

ক্যানভাসটা বোধহয় চিরকালই ব্ল্যঙ্ক। তবুও বারবার নতুন রং দিয়ে তাকে ভরতে চেয়েছে। কিংবা সাজাতে চেয়েছে তাকে জীবন থেকে কুড়িয়ে আনা ধূসর মাটির প্রলেপ দিয়ে, সাজাতে তাকে নতুন রং-এর সম্ভারে। যতবারই আঁকতে চেয়েছে ছবিটা, আবার তা মিলিয়ে গেছে রং থেকে বেরং-এ, বর্ণ থেকে বর্ণহীন ধূসরতায়, পাওয়া থেকে না-পাওয়ার চিত্রগাথায়। রং-এর ঔজ্জ্বল্য থেকে বর্ণহীন ক্যানভাসে।

কোন রং-এর ছবি? কার ছবি? কীসের ছবি? কেনই বা তার নারী মন বারবার একটা ছবি আঁকতে চায়? জৈবিক জীবনে স্বাক্ষর আঁকতে চায় পূর্ণতার রঙে ভরা ক্ষুদ্র জীবনের পরিব্যপ্তিতে?

তখন ইন্দ্রনীলের ঠোঁটটা নতুন কিছু চাইত। নন্দিনীর কাঁপা কাঁপা ঠোঁটের রঙে মিলিয়ে ফাগুয়ার হোলি খেলতে।

“উঃ...” নন্দিনীর কাঁপা কাঁপা দেহের,  বুকের ওঠা নামার ঘন ঘন শ্বাস-প্রশ্বাসে।

দেহ খুঁজত দেহ, ছন্দে আনন্দে আবেগের বন্দনা গানে। আজ এত বছর পরে, একটু ভারী হয়ে যাওয়া সুঠাম দেহটা কী আজও কাঁপে? অস্থির আবেগে একা ঘুম ভাঙা অন্ধকারে? মাঝরাতের ছটফটানি কী মিশে যায় চাতকের স্লোগানে! না-পাওয়ার ভাষাহীন বেদনার তানে? নিজেকে আবার খুঁজে দেখার অপরিচিত অভ্যুত্থানে?

ফোনটা বেজে উঠল “নন্দিনী... আমায় চিনতে পারছ?”

“কে?” স্মৃতির ঝাঁপিতে কোন চেনা সুরকে খুঁজছে নন্দিনী।

“চিনতে পারলে না?”

“না তো। কে আপনি?”

ওপার থেকে ভেসে এল একটা মুচকি হাসির শব্দ। তারপর একটা কাশির আওয়াজ। ঠিক ক্রনিক স্মোকারদের যেমন হয়।

“আরেকটু ভেবে দেখ। স্মৃতির পাতা থেকে...” নন্দিনীর মনে হল কেউ যেন কানামাছি খেলছে।

“নাঃ। চিনতে পারলাম না...”

“আর একটু ভেবে দেখ...”

বিরক্ত হয়ে নন্দিনী বলল “নামটা বলুন। তা না হলে ফোন কেটে দিচ্ছি”

ওপাশ থেকে ভেসে এল “বেশ। আমিই কেটে দিলাম। ভাববার সময় দিচ্ছি। ভেবে দেখ”

কলার নিজেই লাইনটা কেটে দিল নন্দিনীকে শূন্যে ঝুলিয়ে রেখে। এক শূন্যতার মধ্যে আরেক শূন্যতা যোগ করে। সাদা পট সাদা রয়ে গেল। রঙিন হল না তুলির স্পর্শে। সেই শূন্যতার মধ্যে, নন্দিনী অতীতের পাতাগুলো উল্টে-পাল্টে দেখার চেষ্টা করল, কে এই অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তি। অতীত থেকে বর্তমানে এমন কাউকে মনে করতে পারল না, যে ধোঁয়াশায় রেখে নন্দিনীকে ফোন করতে পারে। এ জীবনে অনেক বসন্ত থেকে তাপদগ্ধ গ্রীষ্ম পার হয়ে এসেছে। কিন্তু হেঁয়ালি মেশানো অতর্কিতে হঠাৎ ফোন করতে পারে, এমন কারও কথা স্মৃতির র‍্যম মেমরি থেকে ক্যসেও নেই, যে তাকে সমৃদ্ধ করতে পারে।

নারায়ণ নীচের বেল টিপতেই দরজাটা খুলে দিল নন্দিনী। নন্দিনীর হাতে থলিটা এগিয়ে বলল “আপনি বলেছিলেন কচি পাঁঠার মাংস আনতে। দোকানদার বলল পাঁঠার চেয়ে মুরগি বয়সে আরও বেশি কচি। তাই চিকেন নিয়ে এলাম”

“বেশ করেছ” ঝাঁঝিয়ে উঠল নন্দিনী। নারায়ণকে নিয়ে আর পারা গেল না। ও শুধরাবে না। তবুও তো একজন ফাইফরমাশ খেটে দেয়। তা না হলে তো নন্দিনীকেই রোজ রোজ বাজারে ছুটতে হত।

ব্যাগ খুলে দেখল অন্তত চিকেনটা কেটে এনেছে। ভাগ্যিস! বলা তো যায় না। হয়ত গোটা চিকেনটাই নিয়ে আসতে পারে! নারায়ণের পক্ষে কিছুই অসম্ভব নয়।

অনীশ পাঁঠার মাংস ভালবাসে বলেই তো আনতে দেওয়া। উঠতি বয়সে একটু চর্ব-চোষ্য-লেহ্য-পেয় খাবে না, তো কি বুড়ো বয়সে খাবে? যখন সব দাঁত পড়ে গেছে? নন্দিনী ভাবতেও পারে না অনীশ বুড়ো হয়ে যাবে। মেরিন ইঞ্জিনিয়ার অর্ণব বিয়ের কয়েক বছর পরেই হারিয়ে যাওয়ায়, তাকে ইতিহাসের সাজঘরে সাজিয়ে, অনীশকে নিয়েই বাঁচতে শিখেছে নন্দিনী।

কালকে আবার নিজেকে গিয়েই কচি পাঁঠা কিনে আনতে হবে। মুরগির মাংসটা ফ্রিজে ঢুকিয়ে নারায়ণের দিকে তাকিয়ে বলল “মুরগিটা বুড়ো নয় তো?”

“একদম নয়” নারায়ণ জিভ কেটে বলল “দোকানদার বলল একেবারে কচি... পোলট্রির মুরগি তো... কচি ঘাস খেয়ে বড় হয়ে উঠেছে”

পয়েন্টলেস। নারায়ণের যুক্তির পৃষ্ঠে কথা বলা বাতুলতা মাত্র। নন্দিনীর ক্ষমতা নেই নারায়ণের যুক্তির সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার।

“ভাবছিলাম তোকে কিছু শাকসবজি আনতে দেব। থাক...কালকে আমি যখন বেরব, তখন নিজেই কিনে আনব”

“বলুন না দিদিমণি...আমি কিনে আনি...”

“না থাক। আমিই কিনে আনব” একটু থেমে বলল “যা তো – ছাদের গাছগুলোতে একটু জল দিয়ে আয়। কতদিন দেওয়া হয়নি। আবার না মরে যায়...”

নারায়ণ বেরিয়ে যেতেই আবার ফোনটা বেজে উঠল “এখনও চিনতে পারলে না?”

মহা জ্বালাতন তো। আবার সেই লোকটা বলে চলল “বাঃ এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলে? ইন্দ্রনীল আর শ্রীমিতাকে?”

নন্দিনী বাঁ হাতটা অন্যমনস্কভাবে গালের ওপর বোলাতে লাগল। কে এই লোকটা? কতটুকু জানে নন্দিনী সম্বন্ধে? যে ষোলো বছর আগেকার ঘটনাকে ফিরিয়ে আনছে এত বছর পর!

বহুদিন আগের কথা। তখনও নন্দিনীরা কলেজে পড়ে। সেদিন টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছিল। তখন  ইন্দ্রনীলের কাকুলিয়ার ফ্ল্যাটে।  নন্দিনীর বিবস্ত্র দেহটা তার প্রতিটা স্পর্শ দিয়ে উত্তাপ ছড়িয়ে দিচ্ছে ইন্দ্রনীলের রোমশ দেহের প্রতিটা কণায়। আলো আঁধারিতে না বোঝা গেলেও, নন্দিনী বেশ অনুভব করছিল, ঢোঁড়া সাপটা ক্রমশ কেউটের আকার ধারণ করছে। খালি ছোবলটার অপেক্ষায় থর থর করে কাঁপছে নন্দিনীর দেহটা... আর কয়েক মুহূর্ত... এই বুঝি ইন্দ্রনীল একশো আশি ডিগ্রি ডিগবাজি খাবে...

এমন সময়, ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে দরজা খুলে বাইরের টিপটিপ বৃষ্টিকে দমকা হাওয়ায় রূপান্তরিত করে শ্রীমিতা ঘরে ঢুকে নন্দিনীর দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠেছিল “হাউ ডেয়ার ইউ স্লিপ উইথ মাই লাভার?”

নন্দিনী জানত শ্রীমিতা ইন্দ্রনীলের বাড়িতে পিজি থাকে। অন্তত ইন্দ্রনীল সেকথাই বলেছিল। থাকতেই পারে। ‘লাভার’ শব্দটা শুনে আশ্চর্য হয়ে গেল।

‘লাভ’ এর সংজ্ঞাটা ইন্দ্রনীলের কাছে কখনও জানতে চায়নি নন্দিনী। সেই মুহূর্তে শ্রীমিতাকে তার মানে বোঝানো বাতুলতা মাত্র। নন্দিনী নিঃশব্দে নিজের বিবস্ত্র দেহটাকে ইন্দ্রনীলের দেহ থেকে তুলে নিজের প্যন্টি, নীল জিনস আর কালো জ্যাকেটটা গলিয়ে কাকুলিয়ার ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে এসেছিল।

এক অন্য জীবন! ফেলে আসা জীবনকে পেছনে রেখে আবার নতুন করে বাঁচতে চেয়েছিল তার মুছে দেওয়া ক্যানভাসে নতুন রং ছড়িয়ে। ইন্দ্রনীলকে পেছনে ফেলে, অর্ণবের হাত ধরে নতুন জীবন শুরু করে নতুন তুলিতে নতুন চিত্রপট আঁকতে।

সে তো বেশ কয়েক বছর আগেকার কথা। ভুলেই গিয়েছিল। কিন্তু এই অজ্ঞাত ব্যক্তি আবার সে কথা মনে করিয়ে দিল।

“কে আপনি? আমি তো ওই নামের কাউকে চিনি না!”

“সত্যি?” ওপাশ থেকে একটা তির্যক হাসির আওয়াজ ভেসে এল।

যেন বিদ্রুপ করছে নন্দিনীকে। না কি, অন্ধকারের চাদরে মোড়া ওর সত্ত্বাটাকে। না, রি-সাইকল বিন থেকে বার করে আনছে বর্জিত নিজের আমিটাকে? যে আমিটাকে দেখেও দেখতে চায়নি এতদিন।

“কেন বারবার ফোন করে আমায় বিরক্ত করছেন? কে আপনি?”

“সেটা তো আপনারই বলবার কথা”

“আমি রাখছি। আমায় দয়া করে আর ফোন করবেন না”

নন্দিনী আর কথা না বাড়িয়ে কেটে দিল। মনে একটা ভয় দানা পাকতে শুরু করেছে এই ঘোস্ট কলারকে নিয়ে। অনীশকে নিয়ে একা থাকে। তাও আবার পাড়া বর্জিত সল্ট লেকের মত জায়গায়। এতদিন পর্যন্ত শান্তিতেই ছিল। একা একাই থাকতে ভালবাসে। গান শুনে আর কম্পিউটারে ফেসবুক করে সময় কেটে যায়। কখনও রং আর তুলি নিয়ে এলোপাথাড়ি খেলা।

সেই সময়ের ছন্দের মধ্যে এ কোন দ্বন্দ্বে ফেলে দিল তাকে। দুপুরের খাওয়ার আয়োজন করতে করতে স্মৃতির ব্যাক-আপ ড্রাইভ-এ হাতড়ে বেড়াচ্ছিল সেই ঘোস্ট কলারের অস্তিত্ব।

সেদিন রাতে ইন্দ্রনীলের ফ্ল্যাটে তো আর কেউ ছিল না। থাকারও কথা নয়। কলকাতায় থাকার জন্য বাবার কাছ থেকে পাওয়া ফ্ল্যাটটা। পরে শুনেছিল ইন্দ্রনীল শ্রীমিতাকে বিয়ে করলেও শেষ পর্যন্ত সে বিয়ে টেকেনি। ইন্দ্রনীলের কথা আজ আর মনে পড়ে না। তাকে অতীতের রি-সাইকল বিনে ফেলে ক্যানভাসের ছবিটা মুছে দিয়েছিল। শুধু পার্মানেন্টলি ডিলিট করেনি। সেই আন-ডিলিটেড ছবিটা আবার যেন নতুন আঙ্গিকে ভেসে উঠছে।

ইন্দ্রনীলের ছবিটা বিনে ফেলে দিলেও, ইন্দ্রনীলের সঙ্গে সম্পর্কের মধুর অনুভূতিগুলো কী করে এত তাড়াতাড়ি মুছে দেবে? প্রথম জীবনের দৈহিক উন্মাদনা। রিপ্রেসড আধুনিক বাঙালি নারীর শরীরিক বন্দনা। নিজের অচেনা যৌবনের নতুন চেতনা। ক্ষুধার্ত শরীরটা প্রতিটা কোষের মধ্যে নারীত্বের অঙ্গিকার খুঁজছে। সৌন্দর্যের উপাসনায়, মনের বাসনার পূর্ণতায়। ঈশ্বরের দেওয়া অনুভূতিটার পার্থিব বহিঃপ্রকাশ।

শ্রীমিতাকে কী ইন্দ্রনীল প্রশ্রয় দিয়েছিল? বুঝতে পারেনি নন্দিনী। হয়ত দিয়েছিল বলেই শ্রীমিতা সদর্পে কথাগুলো বলতে পেরেছিল নন্দিনীকে। এখন মনে হয় নিশ্চয়ই দিয়েছিল। শ্রীমিতার সঙ্গে সম্পর্কটা কতদূর কিংবা কতখানি নন্দিনী বুঝে উঠতে পারেনি কোনোদিন। আজকেও নয়। সেই মুহূর্তে আগামীর ছবিটা ইন্দ্রনীল আঁকতে চেয়েছিল নন্দিনীকে নিয়ে। অন্তত নন্দিনীর তাই ধারণা হয়েছিল।

“আমার লুকানোর কিছু নেই। আমি ওকে আমার কাকুলিয়া রোডের বাড়িতে থাকতে দিয়েছি। তার মানে ওর সঙ্গে যে আমার কোনো রিলেশন থাকবেই, এমন নয়। এক ছাদের তলায় থাকা মানেই প্রেম নয়। ভবিষ্যৎটা কী তোমার সঙ্গে আঁকা যায় না?”

“কেন যাবে না?” ইন্দ্রনীলের দিকে ফিরে নন্দিনী বলেছিল।

“একটা সেয়ারড অ্যাকমডেশনে কোনো রিলেশনশিপ হয় না। আমাকেও তো বাঁচতে হবে” একটু থেমে বলেছিল “আমার মতো করে”

বুঝতে একটুও ভুল হয়নি যে শ্রীমিতাকেই ইঙ্গিত করেছিল ইন্দ্রনীল... কেন ভাঙল? কেন শ্রীমিতা আজও কাকুলিয়ার ফ্ল্যাটে থাকে, এসব প্রশ্নের মধ্যে ঢুকতে চায়নি নন্দিনী। ব্যাপারটা যখন তাকে কেন্দ্র করে নয়, তখন এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা অবান্তর।

“নিশ্চয়... তাহলে আমাকে নিয়ে বাঁচবে?”

“আপাতত, সেটাই তো চোখের সামনে ভাসছে”

সেই স্বপ্নে দেখা ছবিটা ক্যানভাসে রূপ দেওয়ার আগেই, সেই টিপ টিপ ভেজা রাতে তা মিলিয়ে গেল। মিলিয়ে গিয়েছিল সেই রাতে, শ্রীমিতার চিৎকারে। নন্দিনী বুঝেছিল, ওদের সম্পর্কটা যাই থাক না কেন, শুধু পিজি অ্যাকমডেশনে সীমাবদ্ধ নয়। দৈহিক খিদে ছাড়া নন্দিনী সেখানে বাড়তি। আর যাই হোক না কেন, ইন্দ্রনীলকে নিয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখা ছেলেমানুষি। যদি অন্য একটা সম্পর্ক হয়েও থাকে, একটা সম্পর্ক ভেঙে আরেকটা সম্পর্ক তৈরি হলেও স্থায়ী হয় না। সেটাও ভেঙে যাবে। কিংবা শ্রীমিতা সেটা ভেঙে দেবে। এক অস্থির জীবনের চোরাবালিতে ঘর ভেঙে শান্তির নীড় রচনা করার স্বপ্ন দেখা বাতুলতা মাত্র।

তারপর বহুবার নানা রঙে ছবি আঁকার নিরলস প্রয়াস। কত নতুন মানুষ। কত নতুন অভিজ্ঞতা। চলার পথে যে এত রং ছড়িয়ে আছে, জানা ছিল না। তবুও রংগুলো কুড়োতে গিয়েই একটা ছবি আঁকার স্বপ্ন দেখা। ছবি আঁকতে যে বড় ভালবাসে নন্দিনী। কিংবা সব নারীই একটা নিটোল ছবির স্বপ্ন আগলে সারা জীবন বাঁচতে চায়।

নন্দিনীও চেয়েছিল।

আজ এই ফোন পাওয়ার পর বুঝতে পারছে, হয়ত কিছুই মোছেনি। শুধু ব্যাক-আপ ডিস্কে পড়েছিল। এখন আবার মাথা চাড়া দিচ্ছে। ফণা তোলার চেষ্টা করছে।

দুপুরের খাওয়ার পর ইউসুয়ালি ঘুমোয় না নন্দিনী। সিরিয়াল দেখে, বা ফেসবুক করে। যতক্ষণ পর্যন্ত অনীশ স্কুল থেকে না ফেরে। আজ আবার ফেসবুক খুলতেই ইন বক্সে একটা মেসেজ দেখে চমকে উঠল।

“অত সহজেই কি সব কিছু ভোলা যায়? ভুলতে পারবে শ্রীমিতাকে? ভুলতে পারবে ইন্দ্রনীলকে?”

কে মেসেজ পাঠিয়েছে? নামটা দেখল ‘মনের আয়নায়’। অবশ্যই ছদ্মনাম। প্রোফাইল খুলে দেখল অনেক ফ্রেন্ড লিস্টের মধ্যে মনের আয়নায়ও আছে। একাই ফ্রেন্ড, কেবল নন্দিনীর সঙ্গে। হয়ত এই ফেসবুক থেকেই নন্দিনীর হদিস বার করেছে। প্রোফাইলে শুধুই কতগুলো অ্যাবস্ট্র্যক্ট আর্টের ছবি। পেশায় লেখা আছে আর্টিস্ট। লোকটির নিজের কোনো ছবি বা তার চেনা পরিজনদের কোনো ছবি নেই!

বেশ কিছুক্ষণ প্রোফাইল নিয়ে নাড়াচাড়া করার পরও আর নতুন কোন তথ্য খুঁজে পেল না। কোন অজান্তে ফ্রেন্ড লিস্টে ঢুকে পড়েছে, এই নাম-না-জানা আর্টিস্ট। কী ছবি আঁকতে চাইছে জানে না। নন্দিনীকে কোথায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে, তাও জানে না। একটা পরিচয়হীন অস্তিত্ব তার জীবনে উঁকি মারতে চাইছে, ব্যাক-আপকে রিকভার করে – তার বর্তমানের স্ট্যাবিলিটিকে ডি-স্ট্যাবিলাইজ করতে।

নন্দিনী জীবনের ছন্দ থেকে বিচ্যুত হতে চায় না। এই জীবন, তার চলমান ছন্দ, গতি, মাধুর্যটাই বাঁচার একমাত্র হাতিয়ার। সেটা ক্র্যশ করুক সে চায় না। সুখের পৃথিবীতে এটাই যে তার একমাত্র সম্বল। সম্বলটাকে হারাতে চায় না নন্দিনী। অনেক অন্ধকার পেরিয়ে অন্ধকারকে আর দেখতে চায় না সে। বেঁচে থাকতে চায় তার একান্ত নিজস্ব স্বপ্নের দিবালোকে।

কয়েক মুহূর্ত।

ব্লক করে দিল ‘মনের আয়নাকে’। হারিয়ে গেল শিল্পী। মুছে গেল আধুরা ক্যানভাসটা কালো রং-এর আঁচড়ের আগেই মাউসের একটা ক্লিকে।

সারাটা দিন কেমন একটা ঘোরের মধ্যে কাটল নন্দিনীর। সে কিছুতেই কাজে মন বসাতে পারছিল না। সারাক্ষণ মনের মধ্যে ঘুরে ফিরে আসছিলো সেই নামহীন ফোনটার কথা। কে হতে পারে? কে? কী চাইছে তার কাছে? ব্ল্যাকমেল করতে চাইছে? কিন্তু কেন? কী ভাবে? না কি আরো সিনিস্টার কিছু? হাজার প্রশ্ন সারাদিন ওর মাথার ভিতর ঘুরপাক খাচ্ছিল। সে ভেবে পাচ্ছিল না, কী করবে? কার কাছে যাবে? একেক বার, একেক জনের নাম মনে ভেসে এল। কিন্তু কাউকেই সুটেবল মনে হল না। পুলিশের কাছে যাবে? কিন্তু পুলিশকে কী বলবে? সে ঠিক জানেও না, এটা সাইবার ক্রাইমের মধ্যে পড়ে কি না।

সারাটা দিন কেটে গেল। বিকেল গড়িয়ে সন্ধে। সন্ধে গড়িয়ে রাত। একটা অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে দিয়ে সময়টা কাটছিল নন্দিনীর। ডিনারে খাবারগুলো একটু নাড়াচাড়া করেই সে উঠে পড়ল। বিছানায় শোওয়ার পরেও তার সেই অস্বস্তি কাটল না। মনে হচ্ছিল, এখনই বুঝি আবার ফোনটা আসবে। উলটোপালটা চিন্তার ঘেরাটোপ টপকে কখন যে ঘুমের স্রোত এসে তাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল, সে ঠিক নিজেও জানে না।

হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল ফোনের তীক্ষ্ণ শব্দে। একটানা বেজে চলেছে ফোনটা। নন্দিনী ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসল। অজান্তেই ঘড়ির দিকে চোখ চলে গেল … পাঁচটা সতেরো! ভোর হয়ে গেছে!

 ফোনটা আচমকা থেমে গেল। নন্দিনীর বুকটা ধক ধক করে চলছে। ফোনটা থেমে যাওয়ায় তার মনে হল সে নিজের হার্ট বিট শুনতে পাচ্ছে দামামার মতো জোরে জোরে।

ঠিক সেই সময় হঠাৎ আবার ফোনটা বেজে উঠল …