| | | | | | | | | |

Cholochitrer Hal Hakikat Bhobishyot

বাংলা চলচ্চিত্রের হাল হাকিকৎ ভবিষ্যৎ

গৌরবোজ্জ্বল বাংলা চলচ্চিত্রের অগস্ত্যযাত্রা বেশ কিছুদিন আগেই শুরু হয়েছিল। বিশ শতকের স্বর্ণযুগের অবসানে তা এক নতুন মাত্রা পেল। একবিংশ শতাব্দীতে কিছুটা এগনোর পর বেশ বোঝা যাচ্ছে, মিডিওক্রিটিদের দাপটে সেই সংস্কৃতি যৌবনের অন্তেই জীবনের শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছেছে, বার্ধক্য-জাতীয় কোনও বিশেষ পরিণতির তোয়াক্কা না করেই। ‘বাঙালি বা বাংলা’ বিষয়ক আধুনিকতা, বর্তমান ভৌগোলিক বাংলার মাত্র দু-আড়াইশো বছরের উপনিবেশ পর্বের অবদান। এই পর্ব একাই মহাভারতের সাপেক্ষে‘আঠারোশো’। তার আর কী-বা দরকার, দুদিক থেকেই? গাঢ় আঁধারের এক সুদৃশ্য উত্তরীয় জড়িয়ে সমগ্র বাঙালি ক্রমশ কৈশোরের উচ্ছ্বাসে গোগ্রাসে গিলছে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া অতীতর উচ্ছিষ্ট। পুরনো দিনের কথায় আক্ষেপ, অবসরে অশ্রুমোচন।

ঋত্বিক ঘটক, সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, তপন সিংহ, তরুণ মজুমদার, ইত্যাদি অতীত রোমন্থনে বাংলা চলচ্চিত্রের গৌরবোজ্জ্বল অতীত। প্রমথেশ বড়ুয়া, উত্তমকুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, বিকাশ রায়, পাহাড়ি সান্যাল, রবি ঘোষ, ধৃতিমান চ্যাটার্জি ইত্যাদি ফেলে আসা সেই অতীতের সাক্ষর। সুচিত্রা সেন, সাবিত্রী চ্যাটার্জি, মাধবী মুখার্জি, শর্মিলা ঠাকুর, কানন দেবী, সুপ্রিয়া দেবী ইত্যাদি ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইটে অতীতের গৌরবাজ্জ্বল অধ্যায় সৃষ্টি করলেও, প্রতেকেই ছিলেন অভিনয় দক্ষতায় কালারফুল।

আজ নিঃস্ব চলচ্চিত্র দুনিয়া টিকে থাকতে মরিয়া। দেওয়ার কথা দূরে, অস্তিত্বই এখন সংকটে। ভাঙা প্রাগৈতিহাসিক স্টুডিওগুলোতে এমন কী ছিল, যা স্বল্প বাজেটে ভারতবর্ষের বিভিন্ন ভাষায় চলচ্চিত্রের দিশারি? কিংবা বিদেশে সমাদৃত? আজ বুঝি আর কী কিছুই দেওয়ার নেই?  মিডিয়াতে কথার ফুলঝুরি, কাজের বেলায় অষ্টরম্ভা। সে যুগে তো এত মিডিয়ার বাহার ছিল না। তবুও লোকে উদগ্রীব হয়ে প্রেক্ষাগৃহে ভিড় করত। অনেক হলে তো এসিও ছিল না।

কীসের মোহে?

বলতে পারেন তখন ইন্টারনেট আসেনি, টিভিও ছিল না, পরে অবশ্য শনি-রবিবার দূরদর্শনে ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ছবি। বিশ শতাব্দী থেকে একবিংশ শতাব্দীতে এমন কী ঘটল, যে বাংলা ছবির ভরাডুবি? উত্তমকুমারের মৃত্যু, না সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বার্ধক্য। কিন্তু এরাই শুধু যে বাংলা ছবির বক্স অফিস, উৎকর্ষ, এমন তো নয়। যদিও উজ্জ্বল তারকারা ছবি অলংকৃত করতেন, এরাই যে ছবির সাফল্যের চাবিকাঠি, ভাবাটাই ভুল। বাংলা ছবির স্তম্ভ ছিল তার গল্প, যা তখনকার সাহিত্যিকদের লেখা। গল্প বলার ধরন, দক্ষ ক্যামেরা, কালজয়ী সংগীত এবং সর্বোপরি টেকনিক্যাল টিমের একান্ত নিষ্ঠা। গতির যুগের সঙ্গে এডিটিং-এর বিবর্তন হয়েছে, সঙ্গে গল্প বালার ভঙ্গি। একটা দৃশ্যে দীর্ঘক্ষণ আটকে না থেকে, স্বল্প সময় দৃশ্য পরিবর্তন এটাই একবিংশ যুগের স্টাইল।

এই স্টাইল সম্বন্ধে একটু বলা আবশ্যক। একটা দৃশ্য থেকে, সংলাপ কিংবা অভিব্যক্তির মধ্যে দিয়ে চরিত্রের বিন্যাস, ছবিতে স্ক্রিপ্ট লেখার মুনশিয়ানা বোঝায়। তার সঙ্গে গল্পের মধ্যে অন্য আরেকটা গল্প বলা, শুধু একঘেয়েমিই দূর করে না, টুকরো টুকরো অন্য গল্পের প্রবাহের দিকেও ইঙ্গিত করে। দর্শককে আগ্রহী করে। বিদেশে, যারা সাহিত্য নিয়ে গবেষণা করেন, তারা এই ধারা সম্বন্ধে প্রচলিত। বাংলা সাহিত্যে কদ্দুর ছিল জানি না, তবে একবিংশ শতাব্দীর গোঁড়ার দিকে আমার অন্বেষণ উপন্যাসে সেই স্টাইলে বিশ্বাস রেখে, এই বিবর্তনটা আনতে সক্ষম হই। গল্পের আরেকটা দিক হল, মেরুদণ্ড। যা গল্পের দর্শন। সেখানেও আধুনিক নতুন চিন্তাধারা মানুষ খোঁজে। যাকে আমরা বলি টেক-হোম ম্যাসেজ। যা গল্প শেষ হওয়ার পরেও রেখাপাত করে যায়। বিষয়বস্তুর আধুনিকতাও প্রয়োজন। সামাজিক কাঠামোর যে বিবর্তন হয়েছে, তা মাথায় রেখে প্রকাশেরও ঔদার্য প্রয়োজন। ঔদার্য মানে যৌনতা নয়। সত্যি না লুকিয়ে, অকপটে তা বলা। ঘোমটার তলায় খ্যামটা না নেচে, রুঢ় বাস্তবকে সামনে আনা। দরকার হলে নিষ্ঠুর ভাবে।

রহস্য উপন্যাসেও বিবর্তন এসেছে। শারলক হোমস ও অগাথা ক্রিস্টির অনুকরণে অগণিত যে গোয়েন্দা চরিত্র বাংলায় সৃষ্টি হয়েছে, তা আজগুবি। প্রাইভেট ডিটেকটিভকে কেন্দ্র করে গল্প লেখার ট্র্যাডিশনটা কেমন যেন একঘেয়ে। ১৮৩৩ সালে এক ফ্রেঞ্চ সৈনিক, অপরাধী ইউগিন ফ্র্যাঙ্কয়েস ভিডক, কয়েকজনকে নিয়ে লে ব্যুরো ডেস রিসেইনমেন্টস ইউনিভারসেলস পউর লে কমার্স এট ল্য ইন্ডাস্ট্রি নামে প্রথম ডিটেকটিভ এজেন্সি স্থাপন করেন। ১৮৪২ সালে পুলিস ওনাকে জালিয়াতির অপরাধে অ্যারেস্ট করে। ভিডক ও চার্লস ফেড্রিক এই দুজনের হাত ধরেই প্রাইভেট ডিটেকটিভ কনসেপ্টটা রহস্য গল্পে স্থান করে নেয়, যার ভিত্তিতে এডগার অ্যালেন পোর সি আগস্টা ডুপিন ১৮৪০ সালে প্রথম প্রাইভেট ডিটেকটিভ হিসেবে সাহিত্যে আসে। তারই ভিত্তিতে বহুজন ডিটেকটিভ সাহিত্যে স্থান করে নেয়। কতগুলো চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে।

  • মৃত্যুর সময় পুলিস না ডিটেকটিভ, কে ইনভেস্টিগেশন করতে যায়?
  • খুনের কিনারার জন্য বর্তমান যুগে ক’জন ডিটেকটিভের শরণাপন্ন হয়?
  • ডিটেকটিভদের কী পুলিস রিপোর্ট, ফরেনসিক রিপোর্ট জানার অধিকার আছে?
  • তারা কী টেলিফোন কিংবা ইন্টারনেট ট্যাপ করতে পারে?
  • তারা কী ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, ইন্সিওরেন্স ও অন্যান্য ব্যাক্তিগত তথ্য কারও সম্মতি ছাড়া জানতে পারে?

 উত্তর একটাই - না। তাহলে প্রাইভেট ডিটেকটিভ একটি আজগুবি কনসেপ্ট, যা একবিংশ শতাব্দীতে ভিত্তিহীন। আজকের বাস্তবতা মাথায় রেখেই অন্য ধরণের গল্প বিন্যাস বাঞ্ছনীয়। এমনও তো হতে পারে, খুনের ইনভেস্টিগেশন প্রথাগত ভাবেই হচ্ছে, অথচ তার সলিউশন একাধিক ব্যক্তির যুগ্ম প্রয়াসে এগিয়ে গিয়ে তাদের মধ্যেই একজন শেষ করে। উপন্যাসে তাই শুধু খুনিকেই নয়, ফাইন্যালি জ্যাকপট জেতা মানুষটিরও সন্ধান দর্শক করতে পারে। যে হয়ত তদন্তকারীদের মধ্যে নয়। এই অত্যাধুনিক চিন্তার পরিপ্রেক্ষিতে আমার একাধিক রহস্য কাহিনি।  

আসল কথা, গল্পের একটা গতি বাঞ্ছনীয়। যাতে দর্শক মন্থর গতির ছবি দেখে নিরাসক্ত না হয়ে, ছবি দেখাই বন্ধ করে দেয়।

এতগুলো কথা লিখলাম, কারণ সমস্যাটা সেখানে। ‘অনুপ্রাণিত’ হয়ে এখন সব পরিচালক-ই লেখক, কেউ কেউ আবার অভিনেতা, সুরকার, গায়ক-গায়িকা, এডিটর, ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর, সিনেমাটোগ্রাফার। প্রযোজকের বরমাল্য পেলে, নায়ক-নায়িকা হতে কতক্ষণ? কবিগুরুর দেশে, আজকের চলচ্চিত্র জগতে সবাই সর্বগুণ সম্পন্ন হতে চায়, প্রতিভার দাক্ষিণ্য ছাড়াই। মধ্যরাতের পার্টি আর পেজ থ্রি তে অস্তিত্ব বেঁচে থাকবে। আর কিছু না হোক, খেয়ে-পরে টিকে থাকা যাবে। কথাগুলো ভালো না লাগলেও, এই ‘বহুমুখী গুণধারিরা’ যে নিজের অস্তিত্বকে টিকয়ে রাখতে, শুধু বাংলা চলচিত্রকে রসাতলে পাঠাচ্ছে, তাই নয়, ইউনিটের অসংখ্য কর্মচারীদের রুজি রোজগারের বারোটা বাজাচ্ছে, একবারও তাদের কথা না ভেবে। রসবসে বাঙালি দর্শকদের মানসিক সূক্ষ্মতা ভোঁতা করে, কালচারল বাঙালিকে তামিল রিমেকে ঠেলে, তাঁর নিজস্বতার সর্বনাশই শুধু করছে না, একটা গোটা জাতীকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। অন্যের গল্প টুকে নিজের নামে চালানো এদের নিত্যনৈমিত্তিক অভ্যাস। সৃষ্টির আগে সেলিব্রিটি হতে হবে। তাই সাত সকালে বোঁচকা কাঁধে বেড়িয়ে পড় মিডিয়া বাবুদের পদলেহন করতে। গতিহীন ঘূর্ণিপাকে চিন্তাশক্তি ফিউজড। হোয়াট বেঙ্গল থিঙ্কস টুডে, ইন্ডিয়া ফরগট ইয়েস্টারডে।  নিজস্ব চিন্তাধারাকে কর্পোরেটের নরম মখমলে স্টারডমে বিক্রি করে খ্যাতনামারা আরও প্রখ্যাত। হারিয়ে গেছে সৃষ্টি। গায়েব হয়েছে কৃষ্টি।

একবিংশ শতাব্দীতে পোঁছে গেছি। বিবর্তন হয়েছে চিন্তাধারার। বিবর্তন হয়েছে চলচ্চিত্রের। প্রশ্ন ওঠে কোনটা সমাদৃত? কোনটা হাইপ? কোনটা পূর্ণতা? কোনটা বিক্রির পণ্য? রুঢ় সত্যটা মানুষ দেখতে চায় না। ভয় পায়। তারা ভালবাসে আলো-আঁধারিতে থাকতে। সত্যকে এড়িয়ে যেতে। রূঢ় বাস্তব যে বড় নিষ্ঠুর কঠোর ভাবাবেগ বিচ্ছিন্ন।

তা বলে কী সে যুগে সব ছিল, এখন কিছু নেই। একেবারেরই নয়। এমন অনেক দক্ষ পরিচালক আছেন যারা তথাকথিত নামি পরিচালকদের চেয়ে কিছু কম নয়, বরং আরও উৎকর্ষ। তাঁরা কোথায়? তাঁরা আমাদের মধ্যেই আছেন। হয়ত মিডিয়া, সঙ্গত কারণে তাঁদের ড্রাম পেটায় না, পাছে তাদের তৈরি সাব-মিডিউক্রিটি ‘সেলেবরা’ এদের জোয়ারে ভেসে যায়। যে প্রযোজকরা ছবি করে, তাদের সেই মানসিক বিন্যাসই নেই, এদের কদর করার। ছবি করতে চাইলে, বিধাতার মতো প্রযোজকরা একশ গণ্ডা শর্ত পাড়ে তা কোনও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন লোকেরই গেলা মুস্কিল। যারা মিডিওক্রিটি তারা আসলে অপদার্থ। যোগ্যতা না থাকায়, তৈলমর্দন করে টিকে থাকার মরিয়া চেষ্টা।  যারা কাজটা জানে বা ন্যূন চিন্তাধারার প্রবর্তক, তাদের আত্মসম্মান বা রুচিতে বাঁধে এসব নিয়ে সময় নষ্ট করতে। গোলামি করা বাঙালিদের, মোসাহেবি যে মজ্জায়। এই দ্বিতীয় শ্রেণি আগামীর রূপকার। তাই মরিয়া হয়ে এদের বহিঃপ্রকাশে হস্তক্ষেপ। প্রচারের দাপটের অন্তরালে প্রকৃত রোশনাই আঁধারে। ফিউজটা জ্বলে যায় প্রথম শ্রেণির প্রচারের দাপটে। দ্বিতীয় শ্রেণি মায়াবী রাতে, তারাদের দিকে উদাস বসে স্বপ্ন দেখে পরিবর্তনের। স্বপ্নের তারাগুলোকে ছোঁয়ার আশায়। কবে আবার নতুন তারা ফুটবে? জীবনটা আবার নিওন আলোর বাইরে, নতুন চাঁদের আলো দেখবে? কবে আবার আজটা কাল হবে, পরশুটা আজ?

করোনার প্রকোপ, প্রকৃতির ভ্রুকুটিরঙ্গে, যে পরিবর্তন একদিন মাঝরাতের অলীক স্বপ্ন ছিল, আজ বুঝি নিয়তির পরিহাসে দোরগোড়ায়। যে ডুবন্ত বাংলা চলচিত্র ভেন্টিলেটারে মৃত্যুহীন কোমায়, ব্রেন ডেড হয়েও বেঁচে ছিল, পৃষ্ঠপোষকতার দম্ভে অজেয়, সৃষ্টিশীলদের মধ্যে বিষ ছড়াচ্ছিল, দম বন্ধ করা এক বাতাবরণে, বাধ্য করছিল আপামর সাধারণকে গিলতে, আজ বুঝি প্রকৃতির রুদ্ররোষে সেই যুগ সন্ধিক্ষণে। অন্যায় যখন মানুষের ক্ষমতার কাছে নতি স্বীকার করে, যখন যুগধর্মের নামে অধর্ম বিচরণ করে। তখন ভারসাম্য আনতে প্রকৃতির আত্মপ্রকাশ।

যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত অভ্যুত্থানমধর্রমস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্ ।।

পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশয় চ দুষ্কৃতাং ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে ।।

(ভগবদ গীতা ৪, ৭-৮)

এমনিতেই লোকে আধুনিক বাংলা ছবি প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে বেশি দেখত না। করোনা মহামারির দৌলতে লকডাউনের জন্য লোকে ঘরবন্দি। বিনদেনের জন্য নেট-এ এত ছবি ও ওয়েব সিরিজের ছড়াছড়ি - নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন, জী, হটস্টার, ভুট, জিওসিনেমা, ভোডাফোন প্লে, এয়ারটেল এক্সস্ট্রিম, হাঙ্গামা, কমতি নেই। আগে প্রেক্ষাগৃহে দেখার অভ্যাসটা এখন নেটের ওপরই নির্ভরশীল। এই সময়, লোকে নেটে ছবি দেখায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে। প্রেক্ষাগৃহ কবে খুলবে, কেউ জানে না। খুললেও মহামারির আশংকায় ওখানে ক’জন যাবে, বলা মুস্কিল। তারপর যদি অর্থহীন বাংলা ছবি হয়, নৈব নৈব চ। ফিরে সেই ওয়েব। এই কম্পিটিশনের বাজারে, যেখানে এত ছবি ও ওয়েব সিরিজ, গুণগত মান নিকৃষ্ট হলে, ধোপে টেকা মুশকিল। খারাপ হলে তো কথাই নেই। প্রচারের আতসায্যও, নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে ফেরাতে পারবে না। ডাল-ভাত গেলা বাঙালি কিন্তু এই লকডাউনে বিরিয়ানিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। মোগলাই ভোজের পর কী পান্তাভাতে ফিরে যেতে চাইবে? মনে তো হয় না।

যারা এতকাল বাংলা ছবিতে আধিপত্যের নামে তাণ্ডব করেছে, এবার বুঝি বিচারের কাঠগড়ায়। উচ্চ মানের ছবি কর, নইলে ফুটে যাও। জগতব্যাপি করোনা প্যান্ডেমিকের বিস্তৃতেতে, বিদেশের মনোরম দৃশ্য দিয়ে ভরান অর্থহীন ছবির ছবির শুটিং যে কবে হবে, কেউ জানে না। এই অবস্থায়, গিমিক ছেড়ে উৎকর্ষ মানের ছবিই বাঁচার পথ। ভেন্টিলেটার থেকে শ্মশান ঘাট, না সর্বনাশ থেকে ফিনিক্সের মতো পুনরুজ্জীবন, মাহামারির লকডাউন তারই ইঙ্গিত।

সৃষ্টি তুমি আত্মদহনে জ্বল, যদি নতুন সুরে, নতুন তানে, না কিছু বলিতে পার।

একবিংশ শতাব্দীর নতুন বার্তা। সময় হয়েছে রবীন্দ্রনাথ থেকে বেরিয়ে রাবিন্দ্রিক চেতনা আর অন্যদের গল্প চুরি না করে, ঊর্ধ্বে উঠে, নতুন কিছু করার। নইলে রবীন্দ্রনাথকে সঙ্গী করে ক্রমশ বাঙালির অপমৃত্যু। সেখানেই কৃষ্টির প্রগতি নতুন কথা বলার। ‘এখন করিছে গান সে কোন নতুন কবি তোমাদের ঘরে?সেই বিশ্বচেতনার স্রষ্টাকে আগামী পুনরায় বরণ করবে সৃষ্টির চিত্রগাথায়। যা প্রচারের দাপটে প্রকট না হয়েও সদা প্রোজ্জ্বল। হাজারও ব্যর্থতার মধ্যেও পথের দিশারি। আগামীর পাথেয়। নাই বা রইল উচ্ছ্বাসের ঘনঘটা। নাই বা রইল বর্ণের বর্ণচ্ছ্বটা। ধূসর বর্ণহীন নিরাম্বরের মধ্যেই হোক সেই ‘ব্যাথার পূজার সমাপননতুনের উদ্ভাসে। চিত্তের মুক্তি। আগামী চলচ্চিত্রের নতুন চিত্রগাথা। নতুন প্রাণের জোয়ারে ভাসা বলিষ্ঠ পদক্ষেপ। যা আতসবাজী ছড়াবে নিঃশব্দে, নীরবে, সন্তর্পণে আগামীর দেওয়ালি উৎসবে।

বন্ধুবর আশিস চট্টোপাধ্যায়ের কলম তারই দিশারিঃ

‘জীবনের ঝরে পড়া ধানগুলো

খুঁটে খুঁটে খেয়ে চলে স্মৃতির পাখিরা

ওগো ব্যাধ তুলো না গাণ্ডীব 

তার চেয়ে হও তুমি নীল বাতিঘর 

দেখাও দিশার আলো নিশার আঁধারে

আজকের অন্ধকারের দমকা আলোর রোশনাই-এর মধ্যে সেটাই তো আগামীর বীজ মন্ত্র। খরাতপ্ত আকালের মধ্যে আগামী বর্ষার না-চেনা মেঘমল্লার। নতুনের স্ফুলিঙ্গ।   

প্রচ্ছেদপটঃ অদিতি চক্রবর্তী