| | | | | | | | | |

Misra Rag

মিশ্র রাগ

এই প্রথম।

বুকটা কাঁপছে। দুরু দুরু। ছোটবেলা থেকে কত শিখেছে। তালিম নিয়েছে, রেওয়াজ করেছে। কিন্তু এই প্রথম স্টেজ পারফর্ম্যন্স। নিজের সাধনার আত্মপ্রকাশ। তাও আবার জি ডি বিড়লা সভাঘরে। ভাবতেও পারেনি কোনো দিন এখানে গাইবার সুযোগ পাবে।

কিছুটা শঙ্কিত হয়ে কল্লোলদাকে বলল “‘আমার বড্ড ভয় করছে”

“ভয়ের কী আছে? সবাইকেই তো একদিন প্রথম পারফর্ম্যন্স দিতে হয়। দেখো, ঠিক উতরে যাবে”

সকালবেলায় রেওয়াজ বা মাঝে মাঝে নিজের একলা ঘরে বসে খালি গলায় সুর সাধা এক। আর হল ভর্তি লোকের সামনে পুরো তবলচি, এস্রাজ নিয়ে পারফর্ম্যন্স করার মধ্যে অনেক তফাত। মেট্রনম নিয়ে গলা সেধেছে মাত্র। সাউন্ড মনিটরিং-এর তো সে তেমন কিছুই জানে না।

একটু বিচলিত ভাবে তবলাবাদক পণ্ডিত তন্ময় মণ্ডলকে বলল “আমি তো কিছুই জানি না, পারব তো?”

“কিচ্ছু ভেব না। আমি সব সামলে নেব। তুমি একাগ্র মনে গান গেয়ে যাও। ঠিক যেমন ঘরে বসে গাও। ভুলে যাও সামনে অডিয়েন্স আছে” তন্ময়ের আশ্বাস।

জি ডি বিড়লা সভাঘরের অনেক সিট ভর্তি। নন্দিনী বুঝতে পারছে না, একজন অনামী নতুন গায়িকার ক্লাসিক্যল গান শুনতে, কী ভাবে এত লোকের ভিড় হল? সে তো কোনোদিন ডোভার লেন মিউজিক কনফারেন্সেরও গায়নি। দূরদর্শনেও ধরে কয়ে একটা সুযোগ করে নেয়নি। যেটুকু শিখেছে নিজের সখের বশে।

কল্লোলদার জন্যই এই সুযোগ। ঘরে বসে বসে যখন হাঁপিয়ে উঠেছিল, তখন কল্লোলদা হঠাৎ একদিন বলল “ঘরে বসে বসে গলা সাধলেই হবে? একটা দুটো প্রোগ্রাম করলে ভাল লাগবে”

“আমাকে কে প্রোগ্রামে গাইতে দেবে?”

“সেটা আমার ওপর ছেড়ে দাও। তুমি রাজি তো?”

ইতস্তত করছিল নন্দিনী। ভয়ও পাচ্ছিল। তারপর মনে হল, ক্ষতি কী? শখের বসে যেটা শিখেছে, তাতে আত্মপ্রকাশ করবার সুযোগ যখন নিজে থেকেই এসেছে, তাকে হেলায় ফেলার কোনো মানেই হয় না। অন্তত ফেসবুক নিয়ে খেলার চেয়ে, বাইরে প্রোগ্রাম করলে মন্দ কী?

কল্লোলদার সঙ্গে সেই কবেকার পরিচয়। এত বছর ধরে দেখছে নন্দিনীকে। নন্দিনী যে ক্লাসিক্যল গান ভালবাসে আর নিয়মিত চর্চা করে সেটা ভাল করেই জানে। এর আগে তো কখনও বলেনি। এই প্রথম যখন বলল, ভবিতব্য সেই দিকেই ইঙ্গিত করছে। সারা জীবন ধরে তো ভবিতব্যের ক্যসিনোতে বসে বাজি খেলছে। এটাও না হয় আরেকটা গ্যম্বল। দেখাই যাক না, কোথায় গিয়ে ঠেকে।

কল্লোলদা স্টেজের পাশে একজনের সঙ্গে কথায় ব্যস্ত। ছেলের আনন্দ আরও দ্বিগুণ। মায়ের গান এই প্রথম হলে বসে শুনবে। মা ফাংশানে গাইবে কখনও ভাবেনি। প্রথম সারিতে উদগ্রীব অপেক্ষায় বসে আছে মায়ের গান শোনার জন্য।

নন্দিনীর সুরের প্রথম আত্মপ্রকাশ। জি ডি বিড়লা সভাঘরের রিভার্ব সাউন্ড সিস্টেমে আরও দরদিয়া হয়ে জানান দেবে। নতুন কণ্ঠের উদাত্ত রাগে। সামনের অন্ধকারটা ভুলে গেছে। সেই দৃশ্য তো চিরকালই অন্ধকার। এক সময় দেখার চেষ্টাও করত। এখন আর করে না। কিংবা দেখতেই চায় না। সীমাহীন অন্ধকারের আঁকাবাঁকা পথের শেষে কী লেখা আছে, সেটাও জানে না। জানার আগ্রহটাও ক্রমশ কমে আসছে। ভবিষ্যৎটা যখন অজানা-অচেনা-অদেখা-অবোঝা, তখন আর ভেবে কী লাভ?

ঘণ্টা বেজে আলো আধারিতে মিশে গেল। সভাঘরের অন্ধকারের বুকে পর্দা খুলতেই আলোর ফোকাসটা গিয়ে পড়ল মাইক্রফোনের সামনে দাঁড়ানো ভাষ্যকার দেবাশিস বসুর মুখে। পরনে সাদা চুড়িদার, বাসন্তী রঙের পাঞ্জাবি।

দেবাশিসের চিরপরিচিত উদাত্ত কণ্ঠে ভেসে এল নন্দিনীর একক অনুষ্ঠানের সম্বোধনী আহ্বানঃ

“সুজন বন্ধু, চৈত্র সন্ধ্যায় ভাবগম্ভীর এই সংগীত সভায় আপনারা স্বাগত। বলতেই পারেন রোজনামচার বারমাস্যা পেরিয়ে এ যেন অনেক অপেক্ষার তের পার্বণের আনন্দ-আস্বাদ। সত্যি তো, সুরের মতো বন্ধু আর আছে কী? সুখে সে হর্ষ, শোকে অশ্রু। এক বিনি সুতোর বাঁধন। নির্ভার নির্ভরতা।

আপনারা জানেন, আজেকের শিল্পী নন্দিনী। শুধুই নন্দিনী। না, পদবির ঘেরাটোপে বাঁধব না নন্দিনীকে। ওর অন্তরে সারাক্ষণ যে অনুরণিত হয় প্রাণের পদাবলি। অন্তর্যামীর সঙ্গে এ এক আন্তরিক যোগ সাধন। শাস্ত্রীয় সংগীতে সম্পূর্ণ সমর্পিত নন্দিনী প্রস্তুত। দুটো তানপুরা বেজে উঠবে আর কয়েক মুহূর্তে। মনে হয় বলিঃ

‘অনন্ত ওই নীরবতার

শুভ্র বরণ সাজ...

সুর তুলুক সেই জমিতে

সূক্ষ্ম কারুকাজ’”

দেবাশিস বসুর উপস্থাপনা শেষ।

নমস্কারান্তে কারুকাজ শুরু হওয়ার আগেই বাসন্তী রং-এর স্বর্ণচুড়ি শাড়ি পরা নন্দিনী সবাইকে নমস্কার জানিয়ে ডায়াসে। তানপুরা বেজে উঠতেই নিজেকে গুছিয়ে নিল। সেই রেশে, তালে ভেসে এল দৃঢ় বলিষ্ঠ দরদি কণ্ঠে আলাপের সুর। রোজ সকালের রেওয়াজের জন্য শুরু থেকেই জড়তা নেই। সাবলীল সুরের আলাপ বন্দানায় ভেসে গেছে নন্দিনী। ভুলে গেছে দর্শকদের কথা। হারিয়ে গেছে তার নিভৃত প্রাণের সশব্দ পূজার আরতিতে। সভাঘরের অন্ধকার যেন মিশে গেছে তার নির্জন পথের একাকী নিভৃতে। ক্লিসে হয়ে যাওয়া নিষ্প্রদীপ জগতে শ্রোতাদের এক নিঃশব্দ উপভোগে।

কী এক ঘোরে গেয়ে চলেছে নন্দিনী। যেন কোনো জনহীন খোয়াইয়ে চাঁদনী রাতে আকাশের না-চেনা নক্ষত্রের খোঁজে। নিজের মনের স্বতঃস্ফূর্ত আবেগে আকাশের বুকে আজ জ্বালিয়ে দিচ্ছে সন্ধ্যাতারার বাতিগুলো। একটা... দুটো... তিনটে। ধীরে ধীরে বাতির আলোকিত রোশনাই-এর দেওয়ালি উৎসবে মেতে উঠেছে তার নিভৃত অন্তরের একক সন্ধ্যারতি। এতদিনের নিভৃত সাধনার প্রথম নৈবেদ্য - অন্তরের পূজার অর্ঘ্য। সুর সেখানে মিলে গেছে সুন্দরের উপাসনায়।

এখন আর সামনে কেউ নেই। কল্লোলদা নেই, ছেলে নেই, সামনে হলের দর্শকও নেই! শুধু দেখতে পাচ্ছে এক সীমাহীন গভীর অন্ধকারের মধ্যে পূর্ণতার ছবি। ক্যানভাসের সব রং-এর একচ্ছত্র প্রকাশ। হয়ত ওখানেই শান্তি লুকিয়ে আছে। হয়ত ওখানেই ইহলোক কোন মায়াময় মধ্যলোকে প্রবেশ করছে মানব জীবনের ধ্রুবতারার পথটুকু দেখিয়ে। চিরশান্তির বাণী শোনাচ্ছে এক ঘোরের মায়াবী লোকে। সেই অন্ধকারটাকে এখন আর ভয় করছে না। তার থেকে পালাতেও চাইছে না। বরং তাকে বরণ করে নিতে চাইছে দু হাত ভরে।

এখানেই ইহকাল।

এখানেই পরকাল।

সব কালের সংমিশ্রণ।

রাগ ললিত গৌরী দিয়ে শুরু। আলাপ থেকে ঝালা। মিশে যাচ্ছে বাসন্তী কেদার থেকে রাগ ভূপনাথ থেকে রাগ শাওনি কল্যাণে। সপ্ত রং-এর ব্যঞ্জনায় আঁকতে চাইছে ধূসর ক্যানভাসের ওপর একটা ছবি। সেটা কী মুহূর্তের! না কি, জীবনের ছবি, না একান্তই তার নিজের! নিজেই জানে না। কেবল একটা শব্দছবি আঁকার চেষ্টা। বর্ণের গীতমালায়। মিশ্র রাগেই যা হয়ত ফুটে উঠবে আপন মাধুর্যে।

ছোটবেলা থেকেই রাগাশ্রয়ী গান ভালবাসত। যখন বয়স বছর ছয় মা তখনই ভর্তি করে দিয়েছিল নাড়া বেধে তালিম নিতে। নিয়মিত সকালে রেওয়াজ করত নন্দিনী। এক সময় শেখা পরিপূর্ণ হল। কিন্তু জীবনের স্রোতে ভাসতে ভাসতে ওটা অতীতের শখ হিসেবেই থেকে গিয়েছিল সীমিত চর্চার মধ্যে। তারপর কত ঝড় বয়ে গেছে জীবনে। গানটাও অতীতের পাতার মতোই ডুবে গেছে জীবনের চোরাবালিতে। ফিরে তাকানোর সময়ও পায়নি। এমনকী গতানুগতিক বিয়ে থেকে ছেলে হওয়া পর্যন্ত।

ইদানীং সিরিয়াল দেখেতে দেখতে একঘেয়েমি। আবার মনোনিবেশ করেছিল কম্পিউটারে। দুপুরবেলা ফেসবুক নিয়ে খেলা। সেটাও, সেরকম তার মধ্যে সেই স্পন্দন জাগাতে পারছিল না। কোথায় যেন একটা তার ছেঁড়া ব্যঞ্জনা। মুক্তি নেই। নিজের কাছ থেকে। অবসরে রেওয়াজটা আবার শুরু। কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে নয়। শুধুমাত্র নিজের তৃপ্তি। কখনও মনে হয়নি তাকে বাইরে প্রকাশ করবে।

যেদিন কল্লোলদা এসে বলল ‘ঘরে বসে বসে সাধলেই হবে? একটা দুটো প্রোগ্রাম করলে ভাল লাগবে’ একটু অবাকই হয়েছিল। কল্লোলদা তার স্বামীর ছোটবেলার বন্ধু। স্বামীর অনুপস্থিতিতে মাঝে মাঝে পরিবারের খবরাখবর নিতে আসে। কিন্তু এর আগে তো কখনও বলেনি।

কল্লোলদার অনেক কন্ট্যক্টস। তার ভিত্তিতেই এই প্রপোসালটা দিয়েছে। প্রথমে একটু দ্বিধা থাকলেও শেষ পর্যন্ত সম্মতি। কল্লোলদা বেরিয়ে যেতেই যেন আবার নিজেকে নতুন করে খুঁজে পেল। নতুন চিত্রপটে। নতুন তুলিতে আঁকা রামধনু থেকে রং কুড়ানো। এক নতুন সাজে। নিজের একঘেয়েমির মধ্যে এক আলোকিত পথের নতুন দিশা। অভিষেকের মন্ত্রটাও নতুন। নিজ মহিমায় দীক্ষিত হতে, নতুন করে মালা গাঁথতেই তাঁর পূজার অর্ঘ্যে। নৈবেদ্য সাজাতে, ইহলোকের মাটিতে বসে অচেনা–অজানা মর্ত্যলোককে নতুন করে পেতে...

গান চলেছে। বিভোর এক অচেনা ছন্দে। কোনো মন্ত্রের মধ্যে নয়। কোনো কল্পনার স্বপ্নেও নয়। মায়ার পৃথিবীটা যেন কায়ার মধ্যে আত্মপ্রকাশ করছে জীবালোকের দীপালোকে। অন্ধকার আর আলো মিলেমিশে একাকার। এক নব অনুভূতির নব আলোকে। এই আলোক দর্শনই তো জীবাত্মার পরমাত্মাকে চেনার প্রথম অভিষেক। আজ যেন নিজের কাছেই নন্দিনীর নতুন করে অভিষেক হচ্ছে। মনের রানি হয়ে মর্ত্যলোকের বেলাভূমিতে দাঁড়িয়ে। স্বর্গলোকের তুলসিতলায়... ঈশ্বরের দেওয়া নিজেরই পরা বরণমালায়...

গান শেষ। রেশ রয়ে গেছে...

দেবাশিস বসু এলেন, বললেন “শুভ্র বরণ এক অনন্ত নীরবতার বুকে সুরের সূক্ষ্ম কারুকাজ বুনছিল নন্দিনী। এই স্বর এই সুরে যেন প্রভাতের স্তোত্র, সন্ধ্যার দেবারতি। ‘সেলিব্রিটি’ হওয়ার দামাল দৌড়ে নেই নন্দিনী। সুরের আরাধনার সময়ও যেন সুরকেই বলেঃ

তুমি আমার ভোরের বেলা

ঝিম দুপুরের দান

শেষ বিকেলে লালের ছোঁয়া

নীল তারাদের গান

আপনাদের মতো গভীর মননের শ্রবণ শিল্পীদের নিত্য আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে জীবনপথে এগিয়ে চলুক নন্দিনী। সস্তা জনপ্রিয়তা নয়, ও সার্থক হতে চায়, চায় পরিপূর্ণ হতে। ওর সব স্বপ্ন সত্যি হয়ে উঠুক একদিন, এই প্রার্থনা।

শুভ রাত্রি”

গান শেষ হয়ে গেছে।

নন্দিনীর আধুরা ছবিটা তখনও আঁকা হয়নি। মন্ত্রমুগ্ধের মতো একে একে বেরিয়ে আসছে শ্রোতারা। সেও অনুভব করছে, তার যাত্রা শুরু হয়ে গেছে। নিজের দিকে ফিরে মনে হচ্ছে, এই যুগ সন্ধিক্ষণে সে যেন অকুল সমুদ্রে ভাসছে একটা হাওয়ার আশায়, তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে জীবনের এক নির্দিষ্ট মোহনায়। খালি মোহনার ঠিকানাটাই জানে না। তারার পূর্ণতার মধ্যে সে যেন নিজের শূন্যতার রাগ শুনতে পাচ্ছে। হাজারও লোকের ভিড়ে কোথায় যেন অন্তরের নির্জনতা তাকে গ্রাস করছে। সে যেন সহস্র কোটি গাছের বনাঞ্চলে, এক বেলাভূমির তেপান্তরে নির্জনে দাঁড়িয়ে। ক্যানভাসে রং চড়িয়েছে ঠিকই, তবু সেই ক্যানভাসটা এখনও শূন্য।

শূন্যতার মধ্যে পূর্ণতা।

না কি, পূর্ণতার মধ্যেও শূন্যতা?

অনীশ মাকে জড়িয়ে ধরে বলল “কী দারুণ গেয়েছ মামি”

কল্লোলদা এগিয়ে এসে বলল “ফ্যন্টাস্টিক”

লাজুক হাসল নন্দিনী। কল্লোলদা লক্ষ করল, এত প্রশংসার মাঝেও নন্দিনীর মধ্যে কোনো অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস নেই। যেমন সে এতদিন ধরে দেখে এসেছে। শান্ত, সংযত, ধীর, অবিচল। এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে, যদি নন্দিনীর কাছ থেকে জানতে পারত ওই মন্ত্রটা, হয়ত নিজের দ্বিধা-দ্বন্দ্বের একটা সুরাহা হত।

নন্দিনী বলল “গানের কোনো অনুষ্ঠান করব ভাবিনি। তোমার জোরাজোরিতেই আজ প্রথমবার পাবলিক ফাংশনে গাইলাম”

“বেশ করেছ। না করলে কি এমনভাবে দুঘণ্টার ওপর তোমার গান শুনতে পারতাম?”

অনীশ পাশ থেকে বলল “মা খ...উ...ব ভালো গায়”

ছেলে তো বলবেই!

নন্দিনীর মনে হল পেশাদারিত্বে নিয়ে যেতে পারেনি বলেই হয়ত মাধুর্য খুলেছে। নেহাত শখের জন্য গাওয়া। নইলে বাজারের নিলামে গানের সত্তাটাই বিক্রি হয়ে যেত। শখগুলো একান্তই আপনার। তাকে বাজারে নিয়ে ফেললে তার গুরুত্ব বা মাহাত্ম্যটা মলিন হয়ে যায়। অর্থ, যশ, প্রতিপত্তির মধ্যে তো শখ আর সাধনা থাকে না। বাজারি নিলামেই ওটার কেনাবেচা হয়।

কল্লোলদা বলেছিল বলে নেহাত শখের বসে এই প্রোগ্রাম করা। যত সুখ্যাতিই হোক না কেন, সে পথে পা বাড়াবে না।

বাড়ি ফিরে কম্পিউটার নিয়ে নাড়াচাড়া করছিল। ফেসবুকে দেখল বাজারি শিল্পীরা নিজেদের ফাংশনের ছবি আর খবরের কাগজের ক্লিপিং পোস্ট করছে। ওদের জন্য ভীষণ করুণা হল। প্রতিটা মুহূর্তে যেন অস্তিত্ব সঙ্কটে ভুগছে। যেন-তেন প্রকারে মুছে যাওয়া ক্যানভাসের ছবিটাকে বারবার বিভিন্ন রং-এর মাধুরী মিশিয়ে আঁকার চেষ্টা করছে। কিন্তু কোনো রং-ই যেন স্থায়ী নয়।

ছবিগুলো আজকে সবাই দেখবে। লাইকস পড়বে। কমেন্টস পড়বে। তারপর কাল সে সব ছবি মুছে যাবে। আবার পাত পেড়ে আদা-জল খেয়ে নেমে পড়বে, আরেকটা আসরের মত্ত বাসরসজ্জা সাজতে। সেই বাসরের আসরও একদিন শূন্য হয়ে যাবে।

এই ‘শূন্যতা’ আর ‘পূর্ণতা’-র যুগলবন্দিতেই জীবনটা পার। মহাকালের পাতায় কিছুই পড়ে থাকবে না। শুধু ক্ষণকালের এক অস্পষ্ট অবয়ব। আর নিজের জন্য কিছু স্মৃতি।

নন্দিনী সেই শূন্যতা-পূর্ণতার গোলকধাঁধায় থাকতে চায় না। সেখানে কোন রং নেই, মাধুর্যও নেই। বিকশিত আমিত্ব।  ফেসবুকের আমিত্বের মজলিস থেকে নিজেকে সরিয়ে নিল নন্দিনী। কম্পিউটার বন্ধ করে উঠে পড়ল।

রংহীন রং-এর মধ্যেই তো রঙিন মাধুর্য। সেই না-ফোটা তুলির আঁচড়ের মধ্যেই সে বিচরণ করতে চায় একাকী।

নিজের ক্ষুদ্র পৃথিবীতে।

সেই ছবিটা অস্পষ্ট হলেও, মুছে যাওয়া ছবির থেকে তো অনেক ভাল। কালহীন যন্ত্রণার বেহাগের সুর না বাজিয়ে মিশে গেল জয়ন্ত শ্রীর মধ্যে। এই সংমিশ্রণেই হয়ত সব রাগ, সব সুর, সব রং বাঁধা। সেখানেই লুকিয়ে আছে সব রাগ। তাদের মিলনের ক্যানভাসে। মিশ্রিত রাগের সমন্বয়েই হয়ত ব্ল্যাংক ক্যানভাসটা আবার নতুন করে প্রাণ পাবে।

সেই ছবির প্রাণ প্রতিষ্ঠার দিকেই মন দিল নন্দিনী।

অন্যমনস্ক ভাবে সেতারটার গায় হাত বোলাতে বোলাতে দুচোখ ছাপিয়ে কান্নার একটা ঝলক। কেন, জানে না। দুঃখের না আনন্দের, তাও তার অজানা। বহুদিন আগে পড়া একটা শ্লোকের কয়েকটা লাইন হালকা কুয়াশার মতো তাকে আস্তে আস্তে ঘিরে ধরছে …

যুজে ব্যাং ব্রহ্ম পূরব্যঃ নমভিরবীয় শ্লোক এতু অধ্যেব সুরেঃ

শৃনন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রাঃ আযেধীমানি দিব্যানি তস্থুঃ।।

বেদাহমেতং পুরুষং মহান্তম্ আদিত্যবর্ণং তমসঃ পরস্তাৎ

তমেব বিদ্বিত্যাহতি মৃত্যুমেতি নান্যঃ পন্থাঃ বিদ্যতেহনেয়ায়।। [1]


[1] শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ