Adhunika Bangla Sahitya: Kichoo Katha

১৯৪০ যে লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা তীক্ষ্ণ তীব্রভাবে হুঙ্কার ছাড়ল ১৯৬০ সালে, নিজস্ব আঙ্গিকে।  নিজেদের স্বতন্ত্রতা নিয়ে। এদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন। যেমন অসীম রায়, দিপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় (শোক মিছিল),হাংরি গ্রুপের মলয় ও সমীর রায়চৌধুরী, অরুনেস্বর ঘোষ, শৈলেস্বর ঘোষ, বাসুদেব দাসগুপ্ত,তুষার রায়, ফাল্গুনি রায়, সুভাষ ঘোষাল, সুব্রত মুখোপাধ্যায়। এই প্রতিষ্ঠানের বাইরে,স্বতন্ত্র লেখার একজন কর্ণধার মলয় রায়চৌধুরী এখনও লেখেন। আজকের যে কোনও লেখকের চেয়ে অনেক বেশি বলিষ্ঠ তার ভাষা।

কেন এরা সাহিত্য জগতে বরেণ্য হয়েও, জন সমক্ষে স্টার নন, তার কাহিনি আর এক অধ্যায়।

১৯৬০ থেকে ১৯৮৪ পর্যন্ত এই টেনাপড়েনের মধ্যে আনন্দবাজারের গ্রুপের পাশে প্রতিদ্বন্দ্বীআরেকটি সংস্থা ছিল - যুগান্তর। ১৯৮৪ তে সেই যুগান্তর পত্রিকা বন্ধ হওয়ার পর, আনন্দবাজার বাংলার সাহিত্যের একমাত্র মুখপত্র। তারা যাকে প্রজেক্ট করবে, তারাই সাহিত্যিক। তার বাইরে সাহিত্য হয় না। সেদিন থেকেই শুরু হল স্খলন। একাধিপত্য, নিজেদের ছাঁচে লেখক তৈরির কারখানা। মলয় রায়চৌধুরী কিংবা অন্যান্য, যারা বলিষ্ঠ নিজস্ব চিন্তাধারায়, তাঁরা এই প্রতিষ্ঠান বিরোধী নিজস্বতা নিয়ে এক বিশাল কর্পোরেটের সঙ্গে এখনও লড়ে যাচ্ছে। ভাল লেখাটাই বড় কথা নয়। নতুন চিন্তাধারাই একমাত্র হাতিয়ার নয়। প্রতিষ্ঠা করার এক অদম্য জেদ চাই। তাই তাঁরা পূজনীয় হলেও, জন সমক্ষে সেই জায়েগা পেলেন না।

এবার আসি প্রতিষ্ঠানে লেখা সম্বন্ধে। তাতে লেখার যেমন সুবিধা আছে, অসুবিধাও আছে।নাম হবে, টাকা হবে, সিনেমা তৈরি হবে। কিন্তু নিজের নিজস্বতা থাকবে না। তাবেদারি গুচ্ছগুচ্ছ লেখা লিখে দিতে হবে। সেখানে তথ্য সংগ্রহের সময় কই? ভুল অনিবার্য। একটা লেখা নিখুঁতভাবে লিখতে গেলে দু-চার বছর তো লাগেই, কিংবা আরও বেশি। প্রচুর রিসার্চ করতে হয়। বিদেশি যুগান্তকারী সাহিত্যিকরা সেভাবেই লেখে। প্রতিষ্ঠানের হয়ে লিখতে গেলে অনেক দায়বদ্ধতা। একটা নির্দিষ্ট সময় লেখা শেষ করতে হবে। ওদের ভাষা বলতে হবে। ওদের ভাবনায় ভাবতে হবে। না হলে, লেখা ছাপান হবে না। স্টার হওয়া যাবে না। পেশাগত সাহিত্যিক হলে, বছরে আট দশখানা লেখা না লিখলে, সেভাবে রোজগারও হবে না।

এই প্রতিষ্ঠানের বাইরে দাঁড়িয়ে নতুন কথা বলার প্ল্যাটফর্ম কৈ?

সাহিত্যের বিবর্তনে অনেক নাম বাজারে বিক্রি হল। অনেক সাহিত্যিক সন্দেশের ছাঁচে তৈরি হল। কর্পোরেট ভাষার শ্লোগানে নিজের স্থান করে নিতে। পাবলিসিটি এল, সিনেমা হল - তাঁরা স্টার হলেন। কিন্তু সাহিত্য তো স্টারডম নয়, নিজস্ব সৃষ্টি। একজন অপরিচিত প্রতিভাবান সাহিত্যিক আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায়ের কথা তুলে বলি “সাহিত্যের ম্যচুরিটির পরিচয় বলতে একদল লোক বোঝেন অকপট যৌনতা অবাধে বলার অধিকার। আমি সে দলে নই। সাহিত্যের সাবালকত্ব শুধুমাত্র যৌনতার খুল্লামখুল্লা বিবরণেই হয় না। আরও অনেক কিছুই প্রয়োজন সেই তকমাটুকু অর্জন করার জন্য। সবচেয়ে বেশি যেটা লাগে, তা হল সেরিব্রাল ম্যচুরিটি, অর্থাৎ মানসিক সাবালকত্ব। সেটা বোঝা যাবে কী করে? উত্তরটা হল, মানসিক বিস্তৃতি দেখে। সাহিত্য জীবনের প্রতিচ্ছবি। জীবন বলতে আমরা কী বুঝি, এ প্রশ্ন করলে নানা জন নানা উত্তর দেবেন, কেন না প্রত্যেকেই জীবনকে নিজের প্যারাডাইম দিয়ে দেখেন এবং বিচার করেন। কিন্তু জীবন শুধুমাত্র একজন বা এক দল বা এক জাতির দর্শন নয়। সাহিত্য তখনই সাবালকত্ব অর্জন করে, যখন অজানা অচেনা দিকগুলো সাহিত্যের মধ্যে প্রকাশিত হয়”

আমারা একবিংশ শতাব্দীতেপোঁছে গেছি। বিবর্তন হয়েছে আমাদের চিন্তাধারার। বিবর্তন হয়েছে সাহিত্যের। বই চার প্রকারের, বিষয় যাই হোক না কেন, বা লেখক যেই হন না কেন।

(১) যা পড়তে ভাল লাগে না,বা পাঠককে ভাবায় না।

(২) যা পড়তে ভাল লাগে না,কিন্তু পাঠককে ভাবায়।

(৩) যা পড়তে তৎক্ষণিক ভাললাগে, কিন্তু ভাবায় না।

(৪) যা পড়তে ভাল লাগে এবংপাঠককে ভাবায়।

কোন শ্রেণিতে কোন বই পড়ে,সেটা মূলতঃ নির্ভর করে পাঠকের নিজস্ব ব্যাকগ্রাউন্ড এবং প্যরাডিজমের ওপর। ব্যাকগ্রাউন্ড বিশেষ ভাবে গুরুত্বপূর্ণ, এই কারণে, কারণ সাহিত্য আস্বাদন করতে গেলে, মানসিক ম্যাচিওরিটিঅত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আসলে যে যেভাবে দেখে, কিংবা দেখতে চায়, বা দেখতে অভ্যস্ত,এই দৃষ্টিভঙ্গিটাই আসল। থমকে দাঁড়ানো সংকীর্ণ ভাবনার অচলায়তনে আজকের দিনে প্রাসঙ্গিক নতুন কোনো চিন্তাধারা মেলে ধরাই একবিংশ শতাব্দীর লেখার মূলমন্ত্র। ব্যবহারিক জীবনে নানা সমস্যা আমরা এতটাই নিজের মতো করে পেয়ে থাকি যে, তাদের সঠিক রূপ আমাদের কাছে বহু সময়ে ভীষণভাবে অস্পষ্ট হয়ে যায়। অত্যন্ত প্রয়োজনেও আমরা না-পারি জানতে, না-পারি তার থেকে বেরিয়ে আসতে। ঘুরপাক খেতে থাকি গতিহীন মননে সময়ের আবর্তে। এবং তখনই নিজেকে আবার তৈরি করতে হয়, মনকে গড়ে তুলতে হয় চিরন্তন মুক্তির আকাঙ্ক্ষায়। সেই মুক্তি যতই তাৎক্ষণিক হোক না কেন, আমাদের চাহিদার কাছে সেটুকু অত্যন্ত জরুরি।

দিনের শেষে বা বলা ভালো সারাদিন,প্রত্যেকের নিজের জন্য একটু স্পেস খুব দরকার। যেখানে এসে প্রতিটা ব্যক্তিত্ব নিজের সামনে দাঁড়ায়, নিজেকে ঝালিয়ে নেয় বা কার্যক্রম তলিয়ে দেখে। সেটুকুর জন্যই বোধহয় প্রতিটা মানুষের কিছুটা নীরবতাও প্রয়োজন। নৈঃশব্দ্য আমাদের অনেকটা ইন্ধন জোগায়।

প্রশ্ন ওঠে কোনটা সমাদৃত? কোনটা হাইপ? উঠে আসে যৌনতা থেকে উন্নততর চিন্তাভাবনা। যা প্রকাশ পেয়েছে  আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায়ের লেখায়।  
কোনটা যৌনতা?  কোনটা পূর্ণতা?   কোনটা সাহিত্য?  কোনটা বিক্রির পণ্য?

বুদ্ধদেববসুর ‘রাত ভোর বৃষ্টি’ কিংবা সমরেশ বসুর ‘প্রজাপতি’ যৌনতা, না কি সত্যকে দেখা?

মনন অবশ্যই পাঠক পাঠিকার একান্ত। কোনটা পরনোগ্রাফি, কোনটা সত্যকে কাছ থেকে দেখা। যেটা সত্য, সেটাই সাহিত্য। আগামী দিনের উপাখ্যান। মনে পড়ে যখন মলয় রায়চৌধুরী,সমরেশ বসুকে কোর্টে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আজকে আরেকবার ফিরে মনে হয় রুঢ় সত্যটা হয়ত মানুষ দেখতে চায় না। ভয় পায়। তারা ভালবাসে আলো-আধারিতে থাকতে। সত্যকে এড়িয়ে যেতে। রূঢ় বাস্তব যে বড় নিষ্ঠুর কঠোর ভাবাবেগ বিচ্ছিন্ন। কিন্তু সব রুঢ়তার মধ্যেতো একটা নতুন চিন্তা খুঁজতে হবে, আগামীকে পথ দেখাতে।

কোনটা সাহিত্য? আর কোনটা বাজারি পণ্য জানতে গেলে তো অপরিচিত অনামি একবিংশ শতাব্দীর লেখা পড়ে দেখতে হয়। 
জানতে হয়।  শিখতে হয়।  বুঝতে হয়।  উপলব্ধি করতে হয়।

ওই প্রতিষ্ঠানের বাইরে দাঁড়ান বলিষ্ঠ লেখকেরা কী বলতে চেয়েছিলেন?  উচ্ছ্বাসের বাইরে আর একবার একটু ভেবে দেখতে?  কালকের ইতিহাস?  না আজকের মরা ছবি?  না আগামীর স্বপ্ন?

সাহিত্যের নামে রবীন্দ্রনাথ বিকচ্ছে। তার ভুল তত্ত্ব বিক্রি হচ্ছে। বেস্টসেলারের হচ্ছে। “ওনাকে পড়েই তো রবীন্দ্রনাথকে জানলাম” হায় পোড়া কপাল দিকশূন্যহীন বাঙালির। এখনও চিনতে শেখেনি তোতা কাহিনির বাইরে আসল সত্যকে। রাবিন্দ্রিক কেচ্ছা হুরমূরিয়ে বিক্রি হয়। বেস্টসেলার হয়। প্রশ্ন ওঠে, তাহলে কী এটাই বাংলা সাহিত্য? স্বামী বিবেকানন্দ আর নিবেদিতার রাসলীলা নিয়েও তো আরেকটা বেস্টসেলার লেখা যায়। কিংবা রামকৃষ্ণ রাসমনির মধুযাপন লীলা।

নাকি নতুন চিন্তাধারা? যা আগে লেখা হয়নি।  

বাংলা সাহিত্যের এই আকালে আমার এক বন্ধুর কথা মনে পড়ে গেলঃ

‘লেখা তুমি আত্মদহনে জ্বল,

যদি নতুন সুরে, নতুন তানে,

না কিছু বলিতে পার’

 

 
Facebook Twitter GooglePlus Wordpress Blogger Linkedin Instagram Tumblr Pinterest Hubpages WhatsApp  © 2000 - 2016 | Cosmetic Surgery in Kolkata | Dr Aniruddha Bose | design by Poligon
This page was generated in 0.020 seconds