Aajo khunje berai

আজও খুঁজে বেড়াই 

সুরটা আজও খুঁজছি।

রাঙা মাটির মেঠো পথে। কোন বসন্ত পূর্ণিমার চাঁদনি আলোয়। লালপেড়ে সাদা শাড়ি পরা আলো আধারির মখমলে জ্যোৎস্নায় লাজ রাঙা ওই শ্যামলা মেয়েটির মুখে।

সুরটা আজও খুঁজছি।

গভীর অমাবস্যার নিশুতি রাতে, একা ঘুম ভাঙা অন্ধকারে। সশব্দ নগরীর নিঃশেষ হয়ে যাওয়া ঔরসে।

সুরটা আজও খুঁজছি।

বিথভেনের মুনলিট সোনাটা থেকে, অজয়ের তিরের নতুন বাঁকে।

নতুন আঙ্গিকে।

রবীন্দ্র পূর্ব থেকে রবীন্দ্র উত্তর, সত্তরের দশক পর্যন্ত সেই সৃষ্টির মাধুর্য যেন হঠাত থমকে দাঁড়াল আশির দোরগোড়ায়। ‘আশি তে আসিও না’ তে এসে, বলাকা আর পাখা মেলতে পারল না। আগুনের স্ফুলিঙ্গের মতন একটি ক্ষণকালের উত্তরণ জ্বলে উঠেও হারিয়ে গেল ‘দেশোদ্ধারের’ কনফিউসড স্লোগানে। একবিংশ শতাব্দীতে এসে, আমারা ফিরে গেলাম আবার আশির দশকে। সেখানে বিথভেনের মুনলিট সোনাটা খেলে বেড়ায় না বীরভূমের মেঠো পথে। রাঙা ধুলা থাকলেও পথটা ভেঙে গেছে। বিলিতি বেগুন এখন রাঙা হয়েও, না পারছে ছন্দ তুলতে দেশি কিংবা বিদেশি বাগানে। সুরটা কোথায় হারিয়ে গেছে চোরাবালির সস্তা মোহের বিস্তৃত স্রোতে।

রাগটা কোথায় যেন বে-রাগ হয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে এক নব রূপের সস্তা অলঙ্কারে। যে অলঙ্কার পারে না তুলতে নব কিশলয়ের ছন্দ, নতুন অঙ্গীকারে। যেখানে সৃষ্টি, আছিলায় অবাঞ্ছিত বৃষ্টি, আজকের নিলামে। সেখানেই শব, করে নিরাস্রুত রব, আজকের এই ঝরা মূল্যহীন সাজান বাগানে। সেই অন্ধ আধারের তিমির নিভৃতে, একটাই প্রশ্ন জাগে মনে, পলে পলে প্রতিক্ষণে।

কোনটা একাল, কোনটা সেকাল, কোনটা ইহকাল, কোনটা পরকাল, এই শ্লোগানের কলরব কী তা জানে? যা বাস্তব কাঠিন্যে সুমধুর, যা ওই নির্মল স্বপ্ন শ্যামলা বধূর, সেটাই তো আগামীর গীত, আমাদের স্বপ্ন সংগীত ফুলঝরা এই খরাতপ্ত বাগানে। যা উত্তাল প্রবাহে আলোড়িত করতে পারে, আজকের এই ঝরা গোলাপের কণ্টক আবৃত ব্যর্থ অহংকারের মেকি দুনিয়ার অন্ধকূপকে।

সেটাই সংকট!

কালকের নয়, আজকের।

তারা আজটাকে দেখতে চায়, পাঁচমিশালির আবর্তে। বিশ্বায়নের ঘূর্ণিঝরে কম্পাস বিহীন এয়ারক্রাফটের মতন, দিকশূন্য ভেসে চলেছে অন্ধকারের গভীরে, তলহীন অতলে, ঠিকানা বিহীন নিরুদ্দেশের ঘোলাটে মহাশূন্যে। প্লেনটা মাটি থেকে ডিভোর্স করে মধ্যাকর্ষণ-এর আবর্ত থেকে ছিটকে পড়েছে, মহাবিশ্বের প্রশস্ত শূন্যতার সীমাহীন গোলোকে।

 কোনটা নিজস্ব, কোনটা নয়, ঝরের আবর্তে ধোঁয়াশায় ভরা। অবশ্যই বিশ্বায়ন, পরিধির ব্যাপ্তি ঘটিয়েছে। কিন্তু এই বিশাল বিস্তৃতির মধ্যে ফিল্টার করতে অক্ষম কোনটা গ্রহণযোগ্য, কোনটা বর্জনীয়। কারণ ভিতটাই যে নড়বড়ে। যে সাধনা, যে অধ্যাবসায় এই ভিতের স্তম্ভ, সেখানেই খামতি। মিডিয়ার মায়াজালে নিজেকে তুলে ধরাটাই মুখ্য, সুর-সাধনা-শিল্প সেখানে গৌণ।

সময় কোথায় সুরের আরাধনার?

প্রচারের আলোর রোশনাইতে বুঁদ হওয়া ঝলমলে হাজারও ওয়াটের প্রখর আলোয়, সময় কোথায় ফিরে যাওয়ার, একনিষ্ঠ সাধনার, সৃষ্টির কঠিন খনিতে?

সেখানে না আছে গ্ল্যমার, না আছে অর্থ, না আছে কালকের কোন স্বপ্ন। আছে শুধু নিরলস তপস্যা। কঠিন কঠর পাথরের বুকে, এমনও তো ভরসা নেই, পাষাণ ভবিতব্য অহল্যার মুক্তি দেবে। তাই রাবিন্দ্রিক অশ্রুমোচন, কিংবা স্বর্ণ যুগের রোমন্থন করে যদি লাইমলাইট কুড়িয়ে নেওয়া যায়, তবে সাধনা করে কী হবে? অর্থ নিশ্চিত, দু-একটা ভিক্ষার উপাধিও জুটে যেতে পারে, জায়গা মতন তোষামোদি করতে পারলে।

তার মধ্যেই পূর্ণতা।

সেটাই শিল্পী স্বত্বার একমাত্র স্বীকৃতি!

হয়ত সেখানেই বিবেকের শূন্যতা।

হারাবার ভয়।

কালকে যদি আরেকজন, নিজেদের তৈরি সজান বাগানে নতুন চারা লাগায়! ভিতটা যে টলমলে হয়ে যাবে। তাই নিজেদের মধ্যে খাওয়াখাওয়ি। পাছে ইঁদুর দৌড়ে পিছিয়ে পড়ে! পাছে অন্য কেউ নিজের সাজান বাগানে নতুন ফুল ফোটায়। তাহলে তো অস্তিত্বটাই সঙ্কটে পড়ে যাবে!

তাই ‘রোখ’।

নিজেরা দলবদ্ধ হয়ে, আগামীর স্রষ্টাকে কোণঠাসা করে, ডুবন্ত নোঙরহীন জাহাজটাকে, ভাসিয়ে রাখার ব্যর্থ প্রয়াস।

প্রকৃত স্রষ্টার তো হারাবার ভয় নেই। কিছু কী তার ছিল, যে সে হারাবে? যা কিছু সৃষ্টি হয়েছে শূন্য থেকে ঈশ্বরের বরমাল্যে আর নিজের কঠিন অধ্যাবসায়।

সেটাই তো আগামীর সুর।

সেটাই তো কালকের গান।

সেটাই তো বুনিয়াদ যার ভিতে গড়ে ওঠে কালপ্রবাহের অমর সুরের মূর্ছনা।

সেই সুরটাকেই তো আমি খুঁজছি।

মেঠো ধুলার রাঙা পথ পেরিয়ে, গভীর অন্ধকারের বুকে - যেখানে চাঁদনি রাত উজ্জ্বল হয়ে ওঠে জ্যজ-এর মেলবন্ধনে। যেখানে বাউল, ভাটিয়ালি মিশে যায় পাশ্চাত্য সিম্ফনির নতুন ক্যডেন্সে। যেখানে সৃজনি কৃষ্টি, বৃষ্টি আনে, গ্লোবালাইজেশনের হাত ধরে বিশ্বের মেহফিলে। ওই জিনস, স্কারট, হট প্যন্টস পরা শ্যামলা মেয়েটির কাজল কালো চোখ দুটো, নতুন রঙের ফাগুয়ায় শানিত দৃষ্টিতে চিকচিক করে ওঠে। এঁকে চলে নতুন সুরের, নতুন ছন্দের মায়াজাল। মনের গভীর মরুভূমিতে নতুন মরূদ্যান গড়তে। তার বহুদিনের স্বপ্ন বাসরে।

রাঙা মাটির মেঠো পথে নয়।

লেজারের কম্পনে ভেসে ওঠে নতুন দিগন্ত, অন্তের ওপারে...

হোরডিং ছেড়ে, স্পন্সরকে পেছনে ফেলে, সবুজ মনের কোমল হৃদয়। ভেসে আসে নব বসন্তের নতুন আজান - কংক্রিট, স্কাই স্ক্যপ্রারের আনাচে কানাচে। ঝংকার তোলে মাল্টিস্টরিড কমপ্লেক্সের ছোট্ট ফ্ল্যাটের সারাউন্ড সাউনডে।

প্রকৃত চিরবসন্তের অমৃত মন্থনে।

সুরটা আজও খুঁজছি।

অতীতকে তার সিঙ্ঘাশনে বসিয়ে, বর্তমানের তালে তাল মিলিয়ে, আগামীর ছন্দের নিশ্চিত বন্দনায়। যা মলিনতা থেকে ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে চলে যুগ পার হয়ে যুগান্তের হৃদয় বাতাসে।

হে আগামীর বকুল - নব কিশলয় হয়ে ফোট, আজকের ক্ষয়ে যাওয়া অপকৃস্টীর প্রাণহীন বিমর্শে। তোমারাই তো আগামীর পথিক - একে দাও কালকের সাক্ষর, আজকের বিলুপ্তির অবাঞ্ছিত কবরে। যেখানে অজস্র বাতির রোশনাই, আঁধারের বুকে জ্বালিয়ে দেবে চিরন্তন পূর্ণতার রংমশাল জ্বালা নতুন ফাগুনের হোলি, আগামীর দেওয়ালি।

সুরটা আজও খুঁজছি।

তোমাদের কাছে।

আগামীর ইতিহাসের নতুন ক্যানভাস আঁকতে।  

 

 
Facebook Twitter GooglePlus Wordpress Blogger Linkedin Instagram Tumblr Pinterest Hubpages WhatsApp  © 2000 - 2016 | Cosmetic Surgery in Kolkata | Dr Aniruddha Bose | design by Poligon
This page was generated in 0.004 seconds