Aa Mori Bangla Bhasha


একবিংশ শতাব্দীতে বেশ কিছুটা হাঁটার পর খালি শুনি ‘গেল গেল’ রব। বিশ্বায়নের ঘোর কলি নাকি বাংলা ভাষাকে গ্রাস করবার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। সংকুচিত লেখক কবিকুল তাই দিশেহারা। যেন দুনিয়ার লোকের আর খেয়েদেয়ে কাজ নেই। কেবল বাংলা ভাষার পেছনে লেগে তার অধঃপতন আনা ছাড়া। বুঝতে পারেনি তথাকথিত গৌরবোজ্জ্বল বাংলা ভাষার অগস্ত্য যাত্রা বেশ কিছুদিন আগেই শুরু হয়েছিল। দেশি মিডিওক্র্যাটদের মধ্যমেধার দাপটে তা যৌবনের অন্তেই জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছেছে। প্রৌঢ়ত্ব বা বার্ধক্য জাতীয় কোনও বিশেষ পরিণতির তোয়াক্কা না করেই। ‘বাঙালি বা বাংলা’ বিষয়ক আধুনিকতা, যা একান্তই কলকাতা-ভিত্তিক, তা বর্তমান ভৌগোলিক বাংলায় মাত্র দু-আড়াইশো বছরের উপনিবেশপর্বের অবদানমাত্র। এই পর্ব একাই মহাভারতের সাপেক্ষে ‘আঠারোশো’। তার আর কী-ই বা দরকার, দু-দিক থেকেই?

বঙ্কিমচন্দ্রের বাংলা ভাষা থেকে রবীন্দ্রনাথ বা শরৎচন্দ্রের ভাষায় যে বিবর্তন এসেছিল, রবীন্দ্রোত্তর পর্বে, কর্পোরেটর আধিপত্যে পুষ্ট লেখকরা, সে বিবর্তন আনতে পারেননি। তার প্রধান কারণ এই কর্পোরেট পুষ্ট লেখকরা বেশিভাগ বাংলায় স্নাতক। একমাত্র নীরদ চৌধুরী বা সমর সেন ছাড়া, যারা বাংলা সাহিত্য চর্চা করেছেন, তাদের ইংরেজিতে তেমন দখল ছিল না। অনেকে ইংরেজির অধ্যাপক হয়ে বাংলা ভাষায় লেখালেখি করলেও, প্রধানত বাংলা মিডিয়ামের বা বাংলার স্নাতক হওয়ার জন্য, ইংরেজি অ্যাক্সেন্টে সড়গড় ছিলেন না। তাদের সাহিত্যের পরিধিও পূর্বাঞ্চলের ব্যাপ্তির বাইরে বেরতে পারেনি। শরৎচন্দ্রের ‘পশ্চিম’ আর এখনকার ‘পশ্চিমের’ মধ্যে বিশাল তফাত। শুধু ভৌগলিক দিক দিয়ে নয়। মানসিক দিক দিয়েও। এই বিবর্তন ফল্গুধারার মতো ঘটে গেলেও, কর্পোরেট মখমল পুষ্ট লেখকদের ক্ষমতা ছিল না, ভাষাগত দিক দিয়ে সে বিবর্তন আনার। বাংলা মিডিয়াম স্কুল থেকে ইংরেজি উঠে যাওয়া দুর্গতি বাড়িয়েছে, এই কর্পোরেট পুষ্ট বাংলা সাহিত্যিকদের। ধান্দা করে কোনও ‘অ্যা’মেরিকান ইউনিভার্সটিতে শর্ট-টার্ম বাংলার অধ্যাপকের ফরেন ট্রিপ জোটালেও, ‘অ্যামেরিকা’ যে ‘আমেরিকা’ নয় সেটুকু বলার ক্ষমতাও ছিল না। আজও মেরুদণ্ড নেই।

‘সেই ট্র্যাডিশন আজিও চলিয়া আসতেছে’

তাই ভয়। গেল গেল রব। নিজেকে যুগোপযোগী না করার ব্যর্থতা।

সারা পৃথিবীতে সাহিত্যের বিবর্তন হলেও, বাংলার মুষ্টিমেয় লোকের হাতে তা এখনও বন্দি। তার প্রধান কারণ আশির দশকে সাহিত্যের কাণ্ডারিদের আকাস্মিক হাত-বদলের কারখানা ভাষার দিকনির্দেশক। তারাই যাদের প্রজেক্ট করেছে, তারাই সাহিত্যিক, বাকিরা নয়। এখন তাদের সাহিত্য কারখানা অস্তাচলে। সেই সঙ্গে পুষ্ট লেখকরাও। হাজার চেষ্টা করেও তো একবিংশ শতাব্দীতে লেখক তৈরির কারখানাকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারেনি। তার প্রধান কারণ, সাহিত্য সৃষ্টিধর্মী। কর্পোরেট ঘেরাটোপের আবদ্ধতায় সৃষ্টি হয় না। নিজস্বতা না থাকলে গ্রহণযোগ্যতা থাকে না। তাই স্থানওপাচ্ছে না।

এখন বিশ্বায়নের সঙ্গে সময় হয়েছে বদ্ধ ঘর থেকে বেরিয়ে জগতটাকে দেখার।

দেখলে ভাল।

নইলে জাদুঘর।

রাতারাতি পরিবর্তন হয় না। রবীন্দ্র পরবর্তী যে পরিবর্তন চুপিসারে সন্তর্পণে আসছিল, বুঝলেও নিজেদের অক্ষমতার জন্য তাঁকে ধামাচাপা দিয়ে অস্বীকার করেছে। তাহলে তো সরে যেতে হয়। নৈব নৈব চ। তাই দলবাজি, ক্ষমতা দখল, হারিয়ে যাওয়া থেকে অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়াস। বিবর্তনের দমকা হওয়াকে দমিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা। তুষাগ্নির মতো স্ফুলিঙ্গ যে একদিন গ্রাস করবে, ভাবতেও পারেনি। আগুণের ঝলকটা দেখলেও, তাপ বুঝলেও, তা যে একদিন দাবাগ্নির মতো বেরিয়ে বাংলা ভাষাকে নতুন লাভার জোয়ারে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে বুঝতে পারেনি। এই মখমল পুষ্ট কিছু উচ্ছিষ্ট তাদের মোসাহেবদের কানে কানে সেই মন্ত্রই দিয়েছে। মোসাহেবরাও তো তাদেরই মতো মিডিওক্র্যাট। তাই তাদের গুরুবাক্য হজম করে, কলেজ স্ট্রিট থেকে নন্দন কানন দাপিয়ে বেড়িয়েছে, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায়। অস্তিত্ব সংকটে মরিয়া রাজনৈতিক তাবেদার, তাই ভাষার বিবর্তনের দাস না হয়ে, অস্তিত্বর ক্রীতদাস। ভাষাকে বৃহত্তর পরিধিতে নিয়ে যেতে গেলে যে যোগ্যতা থাকা বাঞ্ছনীয়, তা এদের নেই। তাই, যে ভাবেই হোক, টিকে থাক।

আর টিকে থাকার জন্য কিছু হাইপড লেখককে তো কর্পোরেট ফেলে দিতে পারে না। এরাই তাদের ব্যবসার চাবিকাঠি। গোলি মারো বাংলা ভাষা। টাকাই কর্ম, টাকাই ধর্ম, টাকাই অস্তিত্ব, টাকাই বাঁচা। তাই সংস্কৃতি। আজকের অস্তিত্বের নীতি। যা পাতে দেবে তাই খাবে। একবিংশ শতাব্দীতে দুনিয়ার ভোল পাল্টালেও, এরা এখনও রাবীন্দ্রিক ঘেরাটোপে আবদ্ধ।

রবীন্দ্রনাথ ছাড়া তো আর আমরা কিছুই ভাবতে পারি না

ভাবতে গেলে তো মুরদ লাগে। সে মুরদ কোথায়? ইংরেজির সীমিত জ্ঞানে, তাকে সাহিত্যের আনতে অপারাগ। বাংলা-ইংরেজি-হিন্দি মেশানো ভাষা অপভ্রংশ। বাংলা ভাষার সর্বনাশ করছে। রোজ যে ভাষায় অগণিত মানুষ কথা বলছে, তা নাকি নিকৃষ্ট। অপাংতেও। জ্ঞানী গুণীর ভাষা নয়। কারণ আমরা ওদের মত 'আধুনিক' নই। আমরা আমাদের মতো। বিগত দুনিয়ায়ই আমাদের গতি। তাঁকে বেচেই আজকের সংস্কৃতি!

যদি বা জ্ঞানী গুণীরা তাদের ভাষায় লেখা আপামরকে পড়াতে পারতেন!

সেখানেও অক্ষমতা!

লোকে বালি থেকে বোরা বোরা ছুটছে, কিন্তু তাবেদারের খাঁচায় বন্দি বাংলা ভাষা আজও রবীন্দ্রনাথের গুণগানে পঞ্চমুখ। রাবীন্দ্রিক দূরদর্শিতার ছিটেফোঁটা হজম করতে পারেনি। যে মহান পুরুষ সে যুগে বসে ‘শেষের কবিতা’ লিখতে পারেন, তিনি ইংরেজির এ থেকে জেড হজম করলেও ‘জ্ঞানী মানি অশিক্ষিত কিংবদন্তি’ (মিডিয়া তোষামোদের পুরস্কার) তার প্রেরণাটুকুও হজম করতে অপারগ।

শূন্যতা দিয়ে পূর্ণতা আনা যায় না। তার জন্য চাই অধ্যাবসায়, মনন আর চর্চা। অ্যাকাডেমি (মাপ করবেন 'পণ্ডিতদের' অ্যাকাডেমি বানানটাও বিভিন্ন ব্যাখ্যায় শোভা পাচ্ছে, ‘একাডেমী’ চত্বর থেকে বাংলা সংস্কৃতির বিভিন্ন পিঠভূমিতে) যেখানে পূর্বাঞ্চলের এক্তিয়ার হয়ত বা বাংলাদেশ থেকেও এখনও বহুলাংশে ভাষাগত দিক দিয়ে আবদ্ধ। যেখানে এখনও অনুবাদ কিংবা শার্লক হোমসের অনুকরণ বাঙালি চিন্তাধারার ব্যর্থতা, অনেক গোয়েন্দা উপন্যাসের সংক্ষিপ্ততা উচ্চারিত, বিক্রিত ও সমাদৃত।

সেখানে যে গেল গেল রব উঠবে, এ আর আশ্চর্য কী?

মিডিওক্র্যাট মোসাহেব সংস্কৃতির বাজারি দালালদের হারানোর ভয়।

এর জন্য বহুলাংশে দায়ী, এতদিন ধরে রাজত্ব করা বাংলা সাহিত্যের বাজারি সম্রাটরা। কর্পোরেট পুষ্ট, দিক ভ্রষ্ট, চিন্তারোহিত লেখককূল। যারা অস্তিত্ব রক্ষাকেই মূলমন্ত্র জেনে বাংলা ভাষাকে নিজেদের বেশ্যালয় সমর্পিত করেছেন। বাঙালিকে মানুষ হতে দেয়নি। নাবালক বাঙালি এদের ওপর ভর করে স্টারডম খুঁজেছে। গত দিয়ে তো স্টারডাম আসে না। আসে নতুন চিন্তার বিন্যাসে। বাঙালি তারকা চায়। নতুন চিন্তাধারা নয়। কলোনিয়াল নাবালক, মালিক কিংবা কর্পোরেট মিডিয়ার পেছন চেটে রাতারাতি সেলিব্রিটি হলে নাম, যশ, প্রতিপত্তি।

বিদেশি সাহিত্যকে উনিশ-বিশ করে নোবেল জয়ের মূর্খ বাসনা। না পেলেই রব। কুয়োতে সরব। আক্ষেপ, হা পিত্যেস, রবীন্দ্রনাথের চর্বিতচর্বণ আস্ফালনেই ক্ষমতার শেষ। তাহলে কী বিদেশি ‘আগ্রাসনে’ বাংলা ভাষা টালমাটাল? কে চেনাবে কাকে আগামী কাল?

মৃত কর্পোরেট?

না কি, অচেনা অন্য এক সখের সাহিত্যিক। কেউ ডাক্তার, কেউ ইঞ্জনিয়ার, কেউ বিজ্ঞানের মেবাবি উত্তরসূরি, কেউবা সখের সৌখিন কাণ্ডারি। রেকর্ড থেকে সিডি, অ্যানালগ থেকে ডিজিট্যাল ক্যামেরা, ছাপা বই থেকে ই-বুক, আগামীর মতো এরাই আগামীর কণ্ঠ, চিন্তা, বিন্যাস। বাংলা ভাষার বিবর্তনও অবশ্যম্ভাবী। যারা মেনে নিয়ে নিজেদের পরিবর্তন করতে পারবেন, তারা টিকবেন। না হলে, রেকর্ডের মতো অ্যাণ্টিক হয়ে জাদুঘরে পরিণত হবেন।

সময় হয়েছে পুরনো থেক নতুনে আসার।

সময় হয়েছে অতীতকে শ্রদ্ধা জানিয়ে আগামীকে বরণ করার।

সময় হয়েছে আজকের যুগে পা রেখে আগামীকে দেখার।

সময় হয়েছে কালকের ভাষা শোনার।

সময় হয়েছে কালকের কথা বলার।

সময় হয়েছে নতুনকে আহ্বান করার।

যারা করতে পারবে, তারাই টিকবে। বাকি সব ইতিহাসের পাতার জাদুঘরে তোষামোদির মেডেলের অলংকার নিয়ে বিবর্ণ ধূসর।

এখন দেখার, কে আগামীর অগ্রসর?

 

 
Facebook Twitter GooglePlus Wordpress Blogger Linkedin Instagram Tumblr Pinterest Hubpages WhatsApp  © 2000 - 2016 | Cosmetic Surgery in Kolkata | Dr Aniruddha Bose | design by Poligon
This page was generated in 0.016 seconds