Chakra (Second Edition) by Aniruddha Bose

 

প্রথম প্রকাশের ভূমিকা

খুনের উপন্যাসের এক চিরাচরিত গত আছে। বিদেশি সাহিত্য থেকে বাংলা সাহিত্য সেই একই গত ধরে এতকাল এগিয়েছে। প্রাইভেট ডিটেকটিভ খুনের কিনারা করছে। কিন্তু বাস্তবে ক’জন যায় প্রাইভেট ডিটেকটিভের কাছে খুনের কিনারা খুঁজতে? বাস্তবে তো কোনও অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ইনসপেক্টর অফ পুলিস কিংবা কোনও জার্নালিস্টই এর তদন্ত করে। কল্পনার ডিটেকটিভকে পেছনে ফেলে একবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতার কথা মাথায় রেখে এমনও তো হতে পারে, যে খুনের তদন্ত করছে, সে তো খুনের সলিউশন নাও করতে পারে? পাঠক যেমন খুনি ও খুনের মোটিভকে সর্বক্ষণ খুঁজছে, যদি পাঠক ডিটেকটিভকেও খোঁজে? যে তদন্তকারীদের মধ্যে একজন নাও হতে পারে? এইসব নানান চিন্তাকে একত্রিত করে প্রচলিত দেশি ও বিদেশি প্রথার বেড়া ভেঙে অনিরুদ্ধ বসুর নতুন চাঞ্চল্যকর খুনের উপন্যাস “চক্র”।  এটা কোনও সাবেকি ঘরানার রহস্য কাহিনি নয়। প্রথাগত হত্যাকাণ্ডের উপন্যাসে পরিবর্তন এনেছে অনিরুদ্ধ। অনিরুদ্ধ বসু বিজ্ঞানের ছাত্র এবং একজন নামী প্লাস্টিক সার্জেন। যুক্তিবিদ্যা এবং আধুনিক প্রযুক্তি বিজ্ঞান তার চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করেছে। খুন এবং খুনিরও বিবর্তন ঘটিয়েছে উপন্যাসটিতে। এই নতুন করে ভাবনাটাই হয়ত এই বইটির আসল বৈশিষ্ট্য। মন্ত্রমুগ্ধের মতো একনাগাড়ে বইটি শেষ করার পর শেষ পঙক্তিটি পড়ে বুঝতে পারলাম খুনের এক নতুন দর্শন।

রত্নাবলি দে চ্যাটার্জি
 

দ্বিতীয় প্রকাশের ভূমিকা

খুনের ও ভূতের বইয়ের বাজারে ভালো কাটতি বলে প্রকাশিকার কাছ থেকে যখন অনুরোধ আসে, তখন কতগুলো চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল।

প্রাইভেট ডিটেকটিভকে কেন্দ্র করে গল্প লেখার ট্র্যাডিশনটা কেমন যেন একঘেয়ে। ১৮৩৩ সালে এক ফ্রেঞ্চ সৈনিক, অপরাধী ইউগিন ফ্র্যাঙ্কয়েস ভিডক, কয়েকজনকে নিয়ে ‘লে ব্যুরো ডেস রিসেইনমেন্টস ইউনিভারসেলস পউর লে কমার্স এট ল্য ইন্ডাস্ট্রি’ নামে প্রথম ডিটেকটিভ এজেন্সি স্থাপন করেন। ১৮৪২ সালে পুলিস ওনাকে জালিয়াতির অপরাধে অ্যারেস্ট করে। ভিডক ও চার্লস ফেড্রিক এই দুজনের হাত ধরেই প্রাইভেট ডিটেকটিভ কনসেপ্টটা সাহিত্যে স্থান করে নেয়, যার ভিত্তিতে এডগার অ্যালেন পোর সি আগস্টা ডুপিন ১৮৪০ সালে প্রথম প্রাইভেট ডিটেকটিভ হিসেবে সাহিত্যে আসে। তারই ভিত্তিতে বহুজন ডিটেকটিভ সাহিত্যে স্থান করে নেয়।

কতগুলো চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে।

·      মৃত্যুর সময় পুলিস না ডিটেকটিভ, কে ইনভেস্টিগেশন করতে যায়?

·      খুনের কিনারার জন্য বর্তমান যুগে ক’জন ডিটেকটিভের শরণাপন্ন হয়?

·      ডিটেকটিভদের কী পুলিস রিপোর্ট, ফরেনসিক রিপোর্ট জানার অধিকার আছে?

·      তারা কী টেলিফোন কিংবা ইন্টারনেট ট্যাপ করতে পারে?

·      তারা কী ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, ইন্সিওরেন্স ও অন্যান্য ব্যাক্তিগত তথ্য কারও সম্মতি ছাড়া জানতে পারে?

 উত্তর একটাই - না। তাহলে প্রাইভেট ডিটেকটিভ একটি আজগুবি কনসেপ্ট, যা একবিংশ শতাব্দীতে ভিত্তিহীন। আজকের বাস্তবতা মাথায় রেখেই এধরনের উপন্যাস লেখা বাঞ্ছনীয়। এমনও তো হতে পারে, খুনের ইনভেস্টিগেশন প্রথাগত ভাবেই হচ্ছে, অথচ তার সলিউশন একাধিক ব্যক্তির যুগ্ম প্রয়াসে এগিয়ে গিয়ে তাদের মধ্যেই একজন শেষ করে। উপন্যাসে তাই শুধু খুনিকেই নয়, ফাইন্যালি জ্যাকপট জেতা মানুষটিরও সন্ধান পাঠক করতে পারে। যে হয়ত তদন্তকারীদের মধ্যে নয়।

ছুরি, পিস্তল এসবের বদলে অন্যভাবেও তো খুন করা যায়। সেই সব অজানা খুনের অস্ত্র কিছুটা আমার ডাক্তারি জ্ঞান, কিছুটা অন্যান্য ডাক্তার ও সায়েন্সের বন্ধুদের সাহায্য নিয়ে, নতুন আঙ্গিকে প্রকাশিত হয় সেপ্টেম্বর ২০১০-এ। কল্পনার ডিটেকটিভকে পেছনে ফেলে, একবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতা মাথায় রেখে, প্রচলিত দেশি ও বিদেশি প্রথার গণ্ডি ভেঙে, নতুন দৃষ্টিকোণে বৈজ্ঞানিক খুনের তথ্য দিয়ে নতুন ছাঁচে একটা রহস্য উপন্যাস লেখার চেষ্টা।

ভারতের বিভিন্ন শহরে অসংখ্য মৃত্যুর জাল ফাঁদা। কে নেই সেই চক্রে?  সিনেমা, মডেল, ধর্মগুরু ভণ্ড বাবা, সো-বিজ দুনিয়ার ডন, প্রগতিশীল ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট, মেধাবী ছাত্র, প্লাস্টিক সার্জেন, সাবেকি পুলিস - সব্বাই। ডবল হেলিক্সের মতো অসংখ্য খুনের মধ্যে রহস্য পেঁচানো হলেও পাঠক উদগ্রীব হয়ে থাকবে গল্প শেষ না হওয়া পর্যন্ত। খুন আর খুনির বিবর্তন আনতে সক্ষম হই। শেষ হয় খুনের নতুন দর্শনে।

উপন্যাসটি বারবার বেস্টসেলারের তালিকায় পৌঁছয়। পরে এর ইংরেজি ভাবানুবাদ আমার দাদা পার্থ প্রতিম রায় ফালক্রাম নাম দিয়ে করেন, যা প্রকাশিত হয় জানুয়ারি ২০১৩-তে। ভাবানুবাদ করার সময় কতগুলো চরিত্রের ও ঘটনার বিশদ উপস্থাপনা করেন, যা এই উপন্যাসে অবশ্যম্ভাবী হলেও, প্রথম প্রকাশনায় সেভাবে বর্ণিত হয়নি। তাঁর সেই উল্লেখিত অংশগুলো, দ্বিতীয় সংস্করণে অন্তর্ভুক্ত হল, যা এই উপন্যাসেকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। আমি তাঁর কাছে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ।

পরিবর্ধিত “চক্র” উপন্যাস দ্বিতীয় সংস্করণ আপনাদের হাতে তুলে দেওয়ার আগে অভিজিৎ মুখোপাধ্যায়কে ধন্যবাদ জানাই। উনি এই উপন্যাসে নানা সংযোজনে বিশেষ সহায়তা করেছেন।

আশা করি এই লেখা আগামীকে রহস্য উপন্যাস সাহিত্যে নতুন দিশা দেখাবে।

অনিরুদ্ধ বসু

Publications of Aniruddha Bose:

- Anweshan

- Dekha (Third Edition) Flipkart eBook Apple iBook googlebook

- Nishabde Flipkart eBook Apple iBook googlebook

- Chakra (Second Edition) Flipkart eBook Apple iBook googlebook

- Tomake (Second Edition) Flipkart eBook Apple iBook googlebook

- The Vision eBook Apple iBook Amazon googlebook

- Pursuit Flipkart eBook Apple iBook Amazon googlebook

- Fulcrum Flipkart eBook Apple iBook Amazon googlebook

- Quest eBook Amazon googlebook

- Canvase Flipkart eBook googlebook

- The Moment eBook Amazon googlebook

- Sfulinga eBook googlebook

- Canvas eBook Amazon googlebook

- Eternal Mayhem Apple iBook Amazon googlebook

- Alo Andhar Apple iBook googlebook

- Conundrum



Chakra (Second Edition)

Find us on facebook Thriller, Bengali
Hardbound, 384 pages, 750 gms
Price: Rs 500/- US $25/-

Keywords: Chakra, Aniruddha, Bose, murder, suspense, Smriti, Publishers, scientific, philosoph

Flipkart
eBook
Apple iBook
googlebook
kobo

 

 

Reviews

It’s an eerie feeling….

Yes, eerie … that’s  the most  apt word to describe the feeling after completing the reading of  “CHAKRA”,  the murder- mystery  book by Aniruddha Basu.

Seven,  err… eight murders! And that too of beautiful young sirens and brilliant young men, spread over the vast expanse of this huge country….and by methods which are chilling to say the least!
Oops! The mere thought makes the blood curdle and the mind dumb.

The story is convoluted like the DNA double helix, yet told in a language that is lucid enough to raise interest in the most indifferent mind.

The story starts with a bang … by the discovery of a nude female dead body in a swimming pool ….the  result of the murder of a beautiful young lady, a famous model from Mumbai in a resort in distant rural  Bengal. Apparently clueless and motiveless, the case is pursued by two Police Officers (and this is a deviation from the usual deployment of Private Detectives in such novels & stories!) - one a handsome young SP hopelessly bogged down in a remote district town, and an aged  ACP bundled out in a dusty room in the Police Head-quarters in Kolkata handling files and records.
The story turns and dwindles through a maze of incidences and murders, with a multitude of characters as diverse as winsome models, show biz Mafioso, corporate bosses, a famous god-man, few brilliant students and a plastic surgeon!

A murder-mystery will be a no-mystery if anything more is said, so let’s put our pen down at this point. Let readers do their own investigative journey with the narrative to reach at the answer of who-dun-it.

As a whole, “CHAKRA” is an un-putdownable murder-mystery with some astounding secrets, a genuine path breaker in its genre.

-by Ashis Kumar Chatterjee


Aniruddha Bose's new book is a thriller with a twist. Breaking away from the usual formula for a whodunit, he explores the genre in an entirely novel way. The plot traverses all across contemporary India, introducing a wide range of characters as the drama unfolds, and there is a subtle social commentary cleverly hidden within the pages. The glamorous world of films and modelling, the rarefied environs of the medical establishment, fast-paced city life and traditional rusticity, celebrities and high profile god men, money and muscle, bureaucrats and politicians, new age entrepreneurs and old fashioned policework blend to constitute an exciting storyline. Red herrings are a plenty, and after many unexpected twists and turns, the pieces all come together at the end in a thrilling finale. Well researched and intelligently written in a racy style, the reader's attention is held until the last page as the deduction links the chain of events in a neat circle, so completing the "CHAKRA".

-by Dr.Ashis Sinha MS, FRCS, Senior Consultant General Surgeon


Crime fiction novels, by and large, belong to a certain genre. Both in English and Bengali literature they have followed general trends. Private detectives are always the ones solving the murder mysteries. In actuality, how many people hire a private investigator? In real life investigations are done by an assistant sub-inspector of police or a journalist.  Is it possible for the reader to leave behind this familiar imaginary detective from the novels? Suppose that the person who is investigating the murder is not the same person who finally solves the case. Whilst the reader is searching for the criminal and the motive for murder, will the reader search for the detective as well? Maybe the actual detective is not one of the investigators! Aniruddha Basu has penned a suspense thriller that has broken the characteristic features of murder mysteries. “CHAKRA” is not an old fashioned crime novel. Aniruddha has brought change to the traditional homicide story. As a student of science and a well known plastic surgeon, logic and modern technology have influenced his thoughts. Both crime, and the criminal, has evolved. This new school of thought may just be the main attribute of this novel. This book is a riveting read. The conclusion reveals a new philosophy behind murder. 

-by Mrs.Ratanabali Day


A Gripping Thriller with Unique Climax

Congratulations Doc. It is bound to stun everybody how you could pen such a thriller after your soulful DEKHA. Those who have read all your four books will soon consider you to be a versatile author who also is a master at what he is writing. Chakra is a fast-paced gripping thriller, which springs up surprise in every chapter, and what is unique that you have sprung one even after the very unusual climax. I feel like sharing some more of my feelings with you.

You have involved the reader from the first sentence and have presented the sequences in such a skillful manner that the reader gets clues but the masterstroke is that you have deftly woven an incident the very next moment to confuse one about the motive or who the culprits are.
I must thank you for making us remember the masterpieces of Saradindu Bandopadhyay and Dr. Nihar Ranjan Gupta where motives were not merely confined to clichéd issues like sex or money. These novels reflected the psychological implications and dealt with the deeply embedded problems of one’s mind. You have treaded that path and superbly blended Ray’s of subtly making the novel a travelogue. I must appreciate the detailed portrayal and accurate descriptions of the various locales, which enables a reader to visualize the ambience without having seen the place physically. Kudos to you for daring to be different and not create a larger than life sleuth like Byomkesh, Kiriti or Feluda. The manner in which you have portrayed the police department with each officer contributing in his own way and thus solving the crime with a combined effort is not only realistic but is also motivating. This novel can surely be a great moral booster to the men in uniform and also inspire any individual. Any person who is bored with life or depressed from routine work can be sure that an opportunity is bound to come knocking at his door but he should be vigilant enough to grab the same and also be diligent in his work to successfully accomplish it. You have also upheld the truth that “United we stand divided we fall”.

The novel appeals more since you have chosen a contemporary subject and current day socio-economic problems, which influence or affect one’s state of mind. The manner in which you have revealed the irresistible lure of show biz and the skeletons in the shadow, the fraudulent Gurus is fascinating and the reader can identify the same relating to recent incidents.

In most thrillers or detective novels, one hardly gets an insight of the psychology of the criminals. But you have explicitly narrated the psychology and the vision of the culprit and also sketched how blind can true love be where it defies all logic, ethics and social virtues.

I hope you will not take it otherwise if I request you to consult someone regarding the Hindi dialogues just the way you have acknowledged the consultation of professionals from different arenas.

To sum up Chakra – a gripping unputdownable psychological thriller.

-by Swagato Dasgupta


চক্রঃ

শুধুমাত্র গোয়েন্দা কাহিনি বা ক্রাইম থ্রিলার নয়,

অন্তর্ভেদী যুগ-যন্ত্রনার অভ্যন্তরে নূতন প্রজন্ম সৃজনের অনন্য অঙ্গীকার

ক্র শুধুমাত্র একটি ডিটেকটিভ উপন্যাস বা ক্রাইম থ্রিলার নয়, সাকুল্যে ৩৮৩ পৃষ্ঠার বইখানি পড়ার পর মনে হয়েছে - এর অন্তর্নিহিত রহস্য অনেক গভীরে, যে পাঠককে বস্তু সত্যের বাইরে ভাবসত্য ও অন্তর সত্যের খোঁজে সর্বার্থে অন্বেষু করে তোলে। লেখকের ইংরেজি-বাংলায় রচিত প্রায় সবগুলি বই পড়ার পর এই উপলব্ধি হয়েছে, পেষায় তিনি বিখ্যাত শল্য চিকিৎসক হয়েও সাহিত্য, বিজ্ঞান, দর্শন, সমাজতত্ত্ব - সব বিষয়েই তিনি সুবিধিত ও মননশীল এবং মানব অস্তিত্বের মূল রহস্য সন্ধানে চির-অন্বেষু রয়েছেন। মানুষ মূলত অত্যন্ত স্বার্থপর, চূড়ান্ত ভোগপ্রিয়, দুর্দমনীয় আকাঙ্ক্ষার জগতে সীমাহীন স্বেচ্ছাচারী। আত্মপ্রতিষ্ঠার অলিন্দে অলিন্দে ভোগবাদী মানুষের নিঃশব্দ বিচরণ। সে সব সময় উচ্চাঙ্খার বশবর্তী হয়ে ভাবে - কী ভাবে, কী উপায়ে কোন পথ অবলম্বন করে সে তার কামনা বাসনার পরিতৃপ্তি ঘটাবে। লেখক এই ভোগ বৃত্তের গহনে মানুষকে নিমজ্জিত হতে দেখে, সমগ্র মানব সমাজের মনে যে প্রশ্নটির জন্ম দিয়েছেন, তা হল - এর বাইরে তবে কী কিছুই নেই?  মানব সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত, ব্যক্তি মানুষ নিরন্তর খোঁজ করতে গিয়ে কি এমন পেয়েছে , যার সমষ্টি রূপ, মানব সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে? তা কি শুধুমাত্র বিজ্ঞান, ধর্ম অথবা এখনও অনাবিষ্কৃত কোনও মৌলিক সত্ত্বা যা অনিবার্য ভাবে মানুষকে সতত অন্বেষু রাখে। মানব সম্পর্কের মূল কাঠামোটি সুনির্দিষ্ট ভাবে তবে কি কখনোই গড়ে উঠবে না, যেখানে মানুষ তাঁর স্বপ্রকাশের রূপটিতে ভালোবাসা, করুণা, মৈত্রী ও সেবার ভেতর দিয়ে ফুটে উঠবে, যা তাঁর চৈতন্যর আঁধার, যা অর্থহীন নয়, লোকোত্তর নয়, তথাকথিত ঈশ্বর সমন্বয় নয়; তা সম্পূর্ণ রূপে বাস্তব সত্য- যা যে কোনও অবস্থাতেই অপ্রতুল নয় বরং অপর্যাপ্ত - কখনো নিঃশেষিত হয় না দানে, যার কণামাত্র গ্রহণ করতে পারলে, মানুষ পরশমণির মতো নিজেকে জ্যোতির্ময় করে তুলতে পারে; যার একটু ছোঁয়ায় সে আলোক সামান্য হয়ে উঠতে পারে।

লেখক এই উপন্যাসের বুনে সূক্ষ্মভাবে যে বোধ জাগিয়ে তুলতে চেয়েছেন, তা হল নিজেকে বাঁচানোর জন্য ও অন্যকে বাঁচাবার ভিন্ন পথ-ও আছে। সে পথের দিশা আমাদের পূর্বপুরুষ দিয়ে গেছেন। আজকের মানুষ, কামনা-বাসনা পরিতৃপ্তির বিশ্বতর ক্ষেত্র রচনা করে তনুসাংসে অঢেল উন্মাদ; সে অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে; আলোয় আলোয় মজে পতঙ্গ প্রথায় পুড়ে মরছে। এই উপন্যাসে লেখক এই বাস্তব সত্যটি চরম মুনশিয়ানার সঙ্গে নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছেন, ‘বুলহিট’ প্রয়োগ কৌশল আরোপ করে চরিত্রগুলি সহজভাবে উপস্থাপিত করেছেন। পাশাপাশি গড়ে তুলেছেন এক গুচ্ছ চরিত্র যারা অন্তর্গত অস্তিত্বের গহনে গড়ে তুলেছে রহস্যাবৃত বুনোট। এর মধ্যে লেখক এমন একটি মৌল চিন্তার উদ্ভব ঘটিয়েছেন, যা নতুন চিন্তাধারার কেন্দ্রবিন্দু।

এরই মধ্যে প্রত্যেকটি চরিত্র তাদের নিজ গুণে বলিয়ান। সে ভওয়ানিশঙ্কর ভণ্ড সাধুই হোক, ডাক্তার আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়, পুলিস মধুসূদন, স্নেহাশিস, পরিতোষ সেন, রোশন, দিলওয়ান সিং, রিপোর্টার কাভিয়াঞ্জলি, ঐত্রেয়ি, অতিন কিংবা মডেল শিরিন বা ব্যাবসায়ি ইন্দ্রাক্ষ্মি, শো-বিজ দুনিয়ার কাণ্ডারি চতুর্বেদী, বা আন্ডারওয়ার্ল্ডের ‘ধামাকা’ কাম্বলে। প্রত্যেকটা চরিত্রই নিজস্বতায় মাকড়সার মতো এই চক্রের জাল বুনেছে।

অতি বিস্ময়ের বিষয় হল, লেখক এমন একটি মৌল চিন্তার উদ্ভব ঘটিয়েছেন, যা এই উপন্যাসকে দর্শনের নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে। শুধু নৈতিকতার ভিতটাই লেখক নাড়ীয়ে দিয়ে যায়নি, নীতিবাদীদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে মানুষ এখনও কত আদিম, নৃশংস ও বিবেকহীন। লেখার মধ্যে বিশদভাবে ব্যাখ্যা পেয়েছে সিজয়েড পারসন্যালিটি ডিসঅর্ডার - অবসেসিভ, কম্পালসিভ পারসন্যালিটি, টাইপ-আর, এ রেসিলিয়েন্ট ভ্যারাইটি। যা শেষ পর্যন্ত সাব্লিমেশনের আকারে রূপায়িত হয়েছে। যার পরিণতি লেখকের ভাষায় ‘দিস লেড টু অ্যাচিভমেন্টস মেটিরিয়ালি, অ্যান্ড অ্যাট এ লেটার স্টেজ টু এ নন-মেটিরিয়ালিস্টিক আপ্লিফটমেণ্ট’। এই কাহিনিতে লেখক ডাঃ অনঙ্গ দত্তর মুখ দিয়ে রোগের মূল কারণগুলি ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

সারা ভারতবর্ষ জুড়ে চক্রের পরিধি বিস্তৃত। চরমতম দৈহিক লালসা চরিতার্থ করতে এক শ্রেণীর শঠ, ভণ্ড, প্রতারক, সাধুবেশী শয়তান, সমাজ জীবনকে যৌনতার দিকে ঠেলে দিয়ে সুকুমার মতি সহজ সরল নিষ্পাপ জীবনগুলোকে অকালে ঝরিয়ে দিচ্ছে। তারা যৌনতার আবাহ ও পরিমণ্ডল তৈরি করে সারা ভারতবর্ষ জুড়ে যৌন ব্যাবসা চালিয়ে যাচ্ছে। এই করে জড়িয়ে পড়েছে অতি উচ্চ-শিক্ষিত ছেলে মেয়েরা যারা নিম্ন-মধ্য-উচ্চবিত্ত থেকে আত্মপ্রতিষ্ঠার তাগিদে ঘর থেকে বের হয়ে এসেছে। এই জীবনকে বেছে নিতে এরা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, রাজনীতিবিদ, পুলিস অফিসার, সাংবাদিক, কে নেই এই চক্রের গভীরে!

এই উপন্যাসে, নতুন দর্শনের প্রতিষ্ঠাতার পরিপ্রেক্ষিতে লেখক কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেছেনঃ সক্রেটিস, জরাথ্রুস্ট, যীশু, গৌতম বুদ্ধ, গ্যালিলিও, জওয়ান অফ আর্ক, রঞ্জিত সিং, চার্লস ডারউইন...  স্বপ্নের রুপায়নেই স্রস্টার সার্থকতা। কিন্তু স্বপ্নের গভীরে বহু প্রশ্ন জেগে ওঠে, পরিক্ষিত সত্যের ভেতর দিয়ে, যতক্ষণ না তা বাস্তব ক্ষেত্রে ফলিত হয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে লেখক অতীতকে বীক্ষণ করেছেন, যে অতীত কোনও ভাবেই নিরঙ্কুশ, নিঃশঙ্ক ছিল না।

নতুন কখনোই সম্পূর্ণভাবে নতুন নয়। তাঁর একটা পরম্পরা থেকেই যায়।

ইতিহাস বলে শান্তির পথ কখনো মানুষকে সুস্থিতি দেয়নি, সংগ্রামের পথ-ই মানুষের সৃষ্টির পথ। মহামানবের আবির্ভাব ঘটলে তাকে বলতেই হবে  - এই সুন্দর পৃথিবীকে ভালবেসে আমি নিজেকে ভালবাসতে শিখেছি। বালজেভ বলেছিল অন্যভাবে একই ভাবনায় উদ্দীপিত হয়ে ‘The world belongs to me because I understand it’। আমাদের পূর্বপুরুষ ‘আমি কে?’ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছিলেন। উত্তর পাবার পূর্বে আরও একটি প্রশ্ন উঠে এসেছিল অন্তর থেকে ‘নিজেকে জানো’। মানুষ নিজেকেই জানে না। যখন জানল তখন বলে উঠল ‘আমি অমৃতের পুত্র, আমার ক্ষয় নেই। আমি অক্ষয় অজর অমর। আমি অসৎ থেকে সৎ-এ, অন্ধকার থেকে আলোয়, মৃত্যু থেকে অমৃতের দিকে চির-ধাবমান, চির পথিক আমি’। এই বিশ্ব-বিবেকবাণীর ফলিত রূপ এখনও মানুষের অধরা থেকে গেছে। যা বাস্তব সত্য, যা মানুষ নিজেকে নিজের মতো করেই খুঁজে চলেছে; বহুমাত্রিক তাঁর চিন্তার ও মননের জগৎ যা একের সঙ্গে অন্যের মেলে না। যুগ প্রতিনিধিত্বের এই মনগড়া আত্মবোধ কণ্ঠে যুগবাণীর যে জোগান দেয় তা একটি বিশেষ যুগেরই উচ্চারণ। তা অবিনাশী হতে পারে যদি তাঁর ফলিত রূপ যুগ যুগান্তরের পরিবহনটা পায় পরম্পরার ভেতর দিয়ে। বাস্তবত, সেই বার্তাবাহীদের কণ্টস্বর ক্ষীণ হয়ে আসে যুগের বিবর্তনে। এ এক অমোঘ সত্য এবং এটাই চিরন্তন সত্যও। কী বিজ্ঞানের দিকে, কী দর্শনের দিকে বা ধর্মের মানুষের বিশ্বাস আটুট থাকে না। যুগে যুগে মানুষ তাঁর প্রাণ প্রতিমাকে নিজের মতো করে সাজিয়ে সাজিয়ে নিতে চায়। নিজেকে জানতে গেলে, যে আত্মবিচার ও আত্মনগ্নায়নের দরকার, আত্মসমীক্ষণের পথ ধরে সে সেখানে যেতে চায় না।

প্লেটো তাঁর আকাদেমিতে নারী-পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে এই নগ্নায়ন ঘটিয়েছিলেন। তাঁর রিপাবলিকে ক্ষীণজীবী দুর্বল রোগগ্রস্তের বাঁচার অধিকার ছিল না। প্রতিষ্ঠান যথার্থ শিক্ষার ভেতর দিয়ে সভ্যতার নব নব উন্মেষ ঘটায় যুগের চাহিদাকে পূর্ণতা দিতে এবং ব্যক্তি তাঁর প্রাণ প্রতিষ্ঠানের স্বরূপ সন্ধানী হয়। যে প্রাণের চাহিদা কামনা-বাসনা দ্বারা নিত্য উপেক্ষিত নিত্যভিক্ষু প্রাণের চাহিদা অপরিসীম বলেই তাকে নিয়ন্ত্রিত ও প্রশমিত করতে বোধিদীপ প্রজ্জ্বলিত করতে হয়। তাঁর জন্যে, সেই সব উপকরণই চাই, যা যজ্ঞ প্রদীপের মতোই স্থায়ী অনির্বাণ আলো দিতে পারে অন্ধকারকে নিয়ন্ত্রণ করতে। যারা এই উপকরণ জোগানের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে তাদের হঠিয়ে দিয়েই অগ্নিহোত্রীকে সমিধ সঞ্চয় অক্ষুণ্ণ রাখতে এগিয়ে যেতে হয়। প্রমিহিউজ মানব কল্যাণের জন্যে এই কজটিই করেছিলেন। সুস্থ সবল সুশিক্ষিত বোধদীপ্ত মানুষ সুখকর সুন্দর জীবনের দিশা পায় যখন তার অন্ধকার থেকে আলোয় উত্তরণ ঘটে। ফ্রয়েড এই সুন্দর সুস্থ জীবনের সমাধান করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত পাগল হয়ে গেছিলেন।

কারণ মানুষ বড় কঠিন। তাঁর বাস্তব্জিবন সর্বতোভাবে বিয়োগান্ত, আকর্ষণীয় তো নয়ই বরং রুক্ষ নৃশংস। এই নিষ্ঠুর নির্মম বাস্তব শেষ পর্যন্ত তাকে অলৌকিকের চরণে প্রণীত হতে বাধ্য করে, যদিও তা কোনও শান্তির পথ নয়; স্বকল্পিত একটা আশ্রয়বোধ নিরাশ্রয়ই সংশয়ী একা মানুষকে সাময়িক ভাবে শান্তি দেয় মাত্র, তাকে সীমাহীন সহিষ্ণু ও ঘাত সহকরে তোলে মাত্র। নর ও নারী একে অপরের পরিপূরক - কেউ ছোট নয়, কেউ বড় নয়। সৌযম্যের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়েই পরস্পরের জন্য সৃষ্ট। তাদের মধ্যে আসামান্য বলে কিছু নেই। অথচ বাস্তব তা স্বীকার করতে চায় না। কিন্তু অসাম্যবোধ জেগে ওঠে যখন ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করতে হয়। এক্ষেত্রে প্রতিটি মানুষ এক একটি একক মাত্র। স্বাধীনতা ও আত্মবোধের জাগরণে মানুষ বিচ্ছিন্ন হতে চায় জৈবিক নিয়মেই। মানুষে মানুষে যখন বিনির্মাণ ঘটতে থাকে তখন এই ভিন্নতর প্রক্রিয়া ত্বারান্বিত হয়। যৌনতা তখন আর স্বচ্ছাচার নয়, তা একটি স্বভাবিক ঘটনা মাত্র। সুন্দর-অসুন্দর তখন আপেক্ষিক ‘Beauty is in the eye of the beholder’।  দেহবোধ তখন স্বীকৃত প্রাকৃতিক প্রকাশ। সুদীপ্ত ব্যাক্তি ও নিজের মতো করে জাগ্রত করতে পারে। নির্দিষ্ট স্ত্রীগুণ, গতিবন্ত সুশিক্ষিত কখনো পরিগ্রহণ করতে পারে না ; সমদর্শী সমাজ নারী ও পুরুষকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করতে শেখায় না। সক্রেটিস বাবা মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্কের ক্ষেত্রটি সুনির্দিষ্ট করতে চেয়েছিলেন। সুস্থ ও বলিষ্ঠ নাগরিক জীবন গড়ে তুলতে সন্তানকে সুনির্দিষ্টভাবে কোনও বাবা মায়ের নিজের ঔরসজাত গর্ভস্থ বলে চিহ্নিত করা যাবে না কারণ তা ব্যক্তিকে স্বার্থপর করে তুলবে। এই সাম্য কী সংঘাতিক বিধ্বংসী অস্থিরতা দয়েকে আনেনি? বীর্যবান যোদ্ধৃত্বের সৃজন ও ব্যাপ্তি সমাজকে গতিদান করে যেমন, সূক্ষ্ম অনুভূতির চর্চা অপর দিকে সৃষ্টিকে দান করে অহিংসা ও সমদর্শী হওয়ার বীজমন্ত্র। এখনে বিজ্ঞানীর সঙ্গে দার্শনিকের চিন্তন ক্ষেত্র মেরু-ব্যবধান পরিলক্ষিত হয়। একটি ছেলের সঙ্গে একটি মেয়ের সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি পরিক্ষিত জীবনের ভেতর দিয়েই তারাই করে নিতে চায়। আরোপিত কিছু নীতিবোধের বিজ বপন করে তাদের আত্মবোধকে আহত করার অধিকার তাই তাড়া মেনে নেয় না।

এ যুগের ছেলে মেয়েরা তাই ফ্রইয়েড ও ডি এইচ লরেন্সেদের পুরনো টুপির সঙ্গে তুলনা করে। এ যুগের নারী-পুরুষ প্রথগত বিবাহ সম্পর্কে না এসে স্বামী স্ত্রীর মতো সারাজীবন কাটাতে পারে। অ্যানা কারেনিনা  ও ম্যডাস বভারিকে ব্যভিচারী আখ্যায় ভূষিত করা হলেও, তাড়া আজকের সমাজে অসম্মানিত নন। যুগ যত বদলাচ্ছে, বিচ্ছিন্নতা তত বাড়ছে। মনুষ্যত্বের সংজ্ঞা নতুন করে নির্মিত হচ্ছে। এক একটি মানুষ এখন নিজেকে সামাজিক একক ভাবতে বিব্রতবোধ করে না। এই বোধের জন্ম হয়েছে মরুভূমির চোরাবালির কর্ম-নিঃসরণ-অবস্থান্তরের মতো বাস্তবক্ষেত্রে নিজের অবস্থানকে একই অবস্থায় দেখতে শিখে। প্রাচ্যের ‘যদিদং হৃদয়ং তব তদন্তু হৃদয়ং মম’ বলার দিন অতিক্রান্ত। এখনও কোনও তরুণ বা তরুণী - ‘আমি তোমাকে ভালবাসি’ বাক্যটি উচ্চারণ করতে কুণ্ঠিত, কারণ ভালবাসার দায় নিতে সেও প্রস্তুত নয়, মনে প্রাণে। দার্শনিক কান্ট লাস্যসিক্ত কোনও প্রকাশকে মরালীটির অন্তর্ভুক্ত করেননি। এখন বহু বছরের বন্ধুত্ব একটি মাত্র হ্যাণদসেক দিয়ে শেষ করে দেওয়া যায়।

যৌনতার প্রকাশও একইভাবে চিহ্নিত, কারণ কোনও এক বিশেষ সম্পর্কের গভীরে নিজেকে খুঁজতে গিয়ে মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ে। প্লেটো তাই সম্পর্কের স্থায়িত্ব স্বীকার করেননি। আজকের নারী অতীতের নারীর সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে অপারগ। কারণ সেদিন এদিনে বিশ্বতর ব্যবধান ঘটে গেছে। আর এই ব্যবধানই গতির জীবনকে গড়ে তুলে মানুষকে নূতন নূতন দিশা দান করে। বিবাহ প্রজাপতির বন্ধন নয়, কারণ আজকের জগতে প্রজাপতির মৃত্যু ঘটিয়েছে মানুষ। ভালোমন্দ এখন মানুষের মূল্যবোধ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। ভগবানের মৃত্যু ঘটে গেছে বলে এখন সবই স্বীকৃত। তাই সক্রেটিসের পরিক্ষিত জীবন এখন কল্পনা মাত্র। মহামতি নীৎসে ঈশ্বর ভাবনার জগতে সুনামি ঘটিয়ে দিয়েছেন। তখন আর কিছুই পরম্পরা নির্দেশিত নয়; প্রাচীন মূল্যবোধ দ্বারাও নিয়ন্ত্রিত নয়। ফ্রয়েড মানব সভ্যতার ভবিষ্যৎ বিষয় অত্যন্ত চিন্তিত ছিলেন শুধু নয়, সন্দিগ্ধ ছিলেন । অন্যদিকে ওয়েবার অনেক বেশি মননশীল ছিলেন বিজ্ঞান, নৈতিকতা ও রাজনীতি বিষয়ে। তিনি নিজেকে স্থায়ী বিয়োগান্ত জীবনে একজন অস্থায়ী অস্তিত্বমাত্র মনে করতেন। তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন, একটা অস্থিরতা অনিশ্চয়তা মানুষকে অহরহ মানুষকে তাড়িয়ে নিয়ে চলেছে। এবং মূল্যবোধ এই সবের বহু ঊর্ধ্বে অধরাই থেকে গেছে। বিজ্ঞান তাকে নাগালের মধ্যে এনে দিতে অপারগ। অঙ্ক কষে নির্দিষ্ট পরিচালনা শক্তির নির্ভুল প্রয়োগ করেও বিচ্ছিন্নতা থেকে মুক্ত করা যাচ্ছে না। এখানে যুক্তিশক্তিহীন মানুষ এখন যে জীবনের অঙ্গনে প্রবেশ করেছে তা নিন্দিত, অনিন্দিত, যাই হোক সে যুগস্বর হয়ে বিশ্বকে মাতিয়ে তুলেছে। তাঁর ভেতর যে বিপ্লব ঘটে চলেছে, তাঁর মূলে অবস্থান করছে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-উৎপাদন জনিত অভাবনীয় সমৃদ্ধি। এখন আর ১৬৮৮ ইংল্যান্ডের গ্লরিয়ান রেভলিউশন বা ফরাসি বিপ্লবের মতো অবস্থার আবির্ভাব ঘটবে না কারণ মানুষের ভেতরে বিপুল বিবর্তন ঘটে চলেছে অহরহ। এখন লেফট রাইটের দ্বন্দ্ব প্রকট হতে পারবে না। এখন মানুষ যতটা নিখুঁতভাবে বিচক্ষন ধুরন্ধর কৌশলী হতে পারবে ততই তাঁর মঙ্গল। তাঁর জন্য নৈতিকতা রক্ষা এখন কোনও অবশ শর্ত নয়। টিকি টুপি ত্রিশূল চার্চের ঘণ্টাধ্বনির এখন বিশেষ তাৎপর্য নেই।

সক্রেটিষের কল্পনায় ছিল সর্বদা উজ্জ্বল আলোকিত শহরজীবন, যেখানে নাগরিকের অন্তরে ছিল সুন্দর ও সত্যের নিত্য অবস্থান। অন্যদিকে হবস অনুভব করেছিলেন মানুষ একান্তই একা এবং তাঁর জীবন ছিল নিত্য বিধ্বস্ত ঘৃণ্য নিচ ও নৃশংস। হবস, লক, রুশো উপলব্ধি করেছিলেন যে কারণেই হোক প্রকৃতিই মানুষকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছে। মানুষের এই অবস্থানের ভগবান নেই, ভগবানের করুণা নেই, অনুকম্পা নেই। মানুষ নিজের চেষ্টাতেই এগিয়েছে এবং নিজের বর্তমান ভবিষ্যৎ ব্যাপারে নিজেই ভাবতে শিখেছে। মানুষ নিজেই অভূতপূর্ব সত্ত্বা।

প্রশ্ন হল, সেই সত্ত্বাটি কী মনস্তত্ত্বই মানুষকে এই প্রশ্নের সম্মুখীন করেছে? যদি এটাই মেনে নিতে হয় তবে তো প্যান্ডেরার বাক্সটি খুলে যায়। সেক্সপিয়ার রচিত চরিত্র ইয়াগোর মতোই বলে উঠবে ‘I never found men who knew how to love himself’। আজকের মনস্তত্ত্ব যার জন্মদাতা। মেকিয়াভেলি, মানুষকে প্রচোদিত করে এই বাস্তব সত্যেই স্থির হতে চায় যে, নিজেকে জানতে মানুষ স্বার্থপর হবেই। তাঁর ‘সেলফ’ বা স্বয়ংকে খুব গভীরভাবে জানতে হবে, নিজের কল্যাণের জন্যেই, যে স্বয়ং বা সেলফ বা স্বয়ংবোধ অত্যাধুনিক এক বোধ যা আত্মার সমার্থবোধক এক নবীন আবির্ভাব বলা যায়। তাঁর উৎকর্ষের পরিধি অসামান্য, যা মানুষকে, নিয়ত সৃজনশীল রাখে।

শিল্পের জন্য স্বাধীনতা চাই-ই চাই। এক্ষেত্রে মানুষ যুক্তিতে চলে না, প্রশ্নাতীত এক অনুভবের আন্দোলনে শিল্পী নিজের মনের বিস্তার ঘটিয়ে চলে। যেখানে কোনও বিজ্ঞানবোধ কাজ করে না। হোমার, দান্তে, রাফেল, বিঠফেন, সেই শিল্পী সত্ত্বার বারক ও বাহক। তারা তাদের যুগ অতিক্রম করে গেছেন। এখন পুরনো কোনও কিছুর আলোকে নতুনকে দেখা যাবে না। এখন যে কালচারের বিপুল পরিবর্তন ঘটে গেছে, সেখানে মানুষ তার প্রাধ্যানেই চিহ্নিত হবে এবং এই বিশেষত্বই তাকে বাঁচিয়ে রাখবে।  মানুষের মনুষ্যত্ববোধ গড়ে ওঠে যুক্তিযুক্ততা ও কল্যাণবোধের জাগরণের মধ্যে দিয়ে। ধর্ম যদি থাকে, তবে যুক্তি তার বুনিয়াদ হবে না কোন ভাবেই। ধর্ম বিশ্বাস মাত্র, বিস্ববান বিজ্ঞান বা যুক্তিনির্ভর নয়। কালচারের জন্ম যুক্তি ও ধর্মের সংশ্লেষ থেকে। যা আমরা ভালবাসি, তাই ভালো।

চক্র উপন্যাসের ভিত, একদিন জেগে ওঠা মোজেস, যীশু, হোমার, বুদ্ধ প্রমুখ মহামানবদের চেতনার বর্তমান রূপে। এই বিকল্প পথে এগিয়ে যেতে ঝুঁকি আছে। যেমন ভগবানের মৃত্যু ঘটিয়ে মানুষ এক চরম ঝুঁকি নিয়েছে। এই ঝুঁকি নেওয়ার পরও আপসের পথ ধরতে আগ্রহী। এই আপসে যদি শান্তি আসে তবে আপত্তিই বা কোথায়? মানুষ যে অভিজ্ঞতা থেকে সার্বিকভাবে মুক্ত তা-ও কি বলা যাবে? নতুনভাবে বাঁচা কিংবা মরা এক নতুন চেতনা। সক্রেটিসের ভাষায় ‘Learning how to die’।

চক্র অন্ধকার থেকে আলোয় উত্তরণের পথ খুঁজতে চেয়েছে। উপন্যাসটি সেই অর্থে মানুষের প্রেরণার দিক। যুগ-যন্ত্রণার সব হলাহল কণ্ঠে নিয়ে অমৃতকামী মানুষ, শুভ-অশুভের দ্বন্দ্বের অবসান ঘটাতে চাইছে। যুক্তির দিক দিয়ে যজ্ঞবেদি রচনায় বিজ্ঞান প্রযুক্তি তাকে কতটা নির্ভরতা দেবে, তা প্রশ্নাতীত না হলেও নতুন চেতনার সংকল্পে মানুষ নতুন করে কিছু পাবে, এ আশা করাই যায়। স্রস্টা যিনি, তিনি সৃজন করেন, পরিগ্রহণের আনন্দ যাদের জন্যে, এই সৃষ্টি তাদের। চক্র বাস্তব জীবন সত্যকে প্রকটিত করে মানুষের এগিয়ে চলার পথকে সুগম করতে চেয়েছে। যুক্তি তর্ক বিশ্বাস অবিশ্বাসের বেড়াজাল থেকে, মানুষের উত্তরণের পথে অধরা বলেই চক্রের চক্রায়ন চলতেই থাকবে। অপর দিকে তার থেকে মুক্তি পাবার সাধনা একই সঙ্গে চলতে থাকবে।

গ্রন্থটি পড়তে শুরু করলে শেষ না হওয়া অবধি পাঠক কী হতে চলেছে, এর পর কী হবে - এই চিন্তায় মজে থাকে। সাবলীল ভাষা সম্পদে ঋদ্ধ গ্রন্থটি। যৌনতার বিবরণ পরিশীলিত মনকে বিব্রত করে কখনো কখনো। ইংরেজি ভাষায় সড়গড় না হলে এই বইয়ের মর্মোদ্ধার করা অসম্ভব মনে হয়।

 

-by Amiya Bandyopadhyay | 20-Mar-2017


Media Reviews


Chakra Review in Ekdin
23-Sep-2017

Social Media
12-Jul-2016

Anandabazar Patrika
19-Nov-2013

Anandabazar Patrika
13-Apr-2013

Anandabazar Patrika
17-Dec-2011

Anandabazar Patrika
03-Sep-2011

Anandabazar Patrika
20-Aug-2011

Saptahik Bartaman
20-Aug-2011

Anandabazar Patrika
20-Aug-2011

Anandabazar Patrika
30-Jun-2011

Anandabazar Patrika
07-May-2011

Anandabazar Patrika
23-Apr-2011

Anandabazar Patrika
25-Dec-2010

Desh Patrika
01-Dec-2010

Boiyer Desh
01-Oct-2010

 

 

 
Facebook Twitter GooglePlus Wordpress Blogger Linkedin Instagram Tumblr Pinterest Hubpages WhatsApp  © 2000 - 2016 | Cosmetic Surgery in Kolkata | Dr Aniruddha Bose | design by Poligon
This page was generated in 2.863 seconds